সরকারি চাকরির হিসাব-নিকাশে সময়টা ঠিক ৩৮ বছর ১৩ দিন। এই দীর্ঘ পথচলার শেষ দিনে চকরিয়া উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের বাতাসে ছিল এক অন্যরকম আবহ। সহকর্মীদের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা, চোখেমুখে শ্রদ্ধা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক প্রবীণ মানুষ—জয়নাল আবেদীন কুতুবী। কর্মজীবনের শেষ দিনটি কেবল একটি বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; ছিল প্রায় চার দশকের নিষ্ঠা, সততা আর মানবিকতার এক উষ্ণ স্বীকৃতি।
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার সন্তান জয়নাল আবেদীন কুতুবী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপসহকারী প্রাণীসম্পদ অফিসার (এফএআই) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। সেই যাত্রার সমাপ্তি হলো গত বুধবার, ২৯ এপ্রিল। শেষ কর্মদিবসে চকরিয়া উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বর্তমান-পুরাতন সব সহকর্মী এক ছাদের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো কর্মস্থলে বিদায় জানাতে।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটি কর্মস্থলে তিনি রেখে এসেছেন একই পরিচয়—সৎ, পরিচ্ছন্ন, দায়িত্বশীল একজন অফিসার। চাকরির শেষ অধ্যায়ে এসে তাঁর ঠিকানা হয় চকরিয়া উপজেলা প্রাণীসম্পদ বিভাগ। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন কর্মজীবনের শেষ দিনগুলো, এখান থেকেই তাঁর অবসরে যাওয়া।
সহকর্মীরা বলছিলেন, কাজের প্রতি জয়নাল কুতুবীর নিষ্ঠা ছিল প্রবাদপ্রতিম। অর্পিত প্রতিটি দায়িত্বকে তিনি গ্রহণ করতেন আদেশ হিসেবে। সেই আদেশ পালন করতেন সততা আর দক্ষতার সঙ্গে। তারই ফল হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের চাকরিজীবনের যাবতীয় তথ্যের যে দাপ্তরিক রেকর্ড—সার্ভিস বুক—সেখানে তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ‘ভালো অফিসার’ উপাধি। সরকারি চাকরিতে এই স্বীকৃতি সহজে অর্জিত হয় না; দীর্ঘদিনের ত্যাগ আর সততার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে এমন পরিচয়।
বিদায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চকরিয়া উপজেলা প্রাণীসম্পদ অফিসার মোঃ আরিফ উদ্দিন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা প্রাণীসম্পদ অফিসার ডা. এএম খালেকুজ্জামান, যিনি একসময় চকরিয়া উপজেলা প্রাণীসম্পদ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চন্দনাইশ উপজেলা প্রাণীসম্পদ অফিসার ডা. ফেরদৌসী আকতার এবং চকরিয়া উপজেলার সাবেক প্রাণীসম্পদ অফিসার সুপন নন্দী। এ ছাড়াও প্রাণীসম্পদ বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত হয়েছিলেন এই বিদায় বেলায়। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কর্মকর্তারা জয়নাল কুতুবীর হাতে তুলে দেন সম্মাননা স্মারক—দীর্ঘ কর্মজীবনের এক প্রতীকী স্বীকৃতি।
স্মৃতিচারণার পালায় বক্তারা যা বললেন, তা যেন একটি মানুষের জীবনের সারমর্ম। দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা বললেন, জয়নাল আবেদীন কুতুবী ছিলেন একজন সৎ, সাহসী ও কর্মদক্ষ অফিসার। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ একজন মানুষ। অভিভূত কণ্ঠে অনেকে স্বীকার করলেন—এত গুণের সমন্বয়ে একজন মানুষ যে নীতিবান হয়ে উঠতে পারেন, তা তাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁদের কথায় ফুটে উঠল সেই বিরল ভালোবাসা, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতা থেকে আসে না, আসে দীর্ঘদিনের সহাবস্থান আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার গভীর শিকড় থেকে।
সহকর্মীদের এই নির্ভেজাল ভালোবাসার জবাবে জয়নাল আবেদীন কুতুবী বললেন কেবল একটি কথা—অবসর জীবনে যেন পরিবার-পরিজন নিয়ে সুস্থভাবে, সুন্দরভাবে বাকি সময়টুকু কাটাতে পারেন, সেজন্য সবার কাছে তিনি দোয়া চান। দীর্ঘ চাকরিজীবনের শেষে এই সরল প্রার্থনাটুকুই যেন বলে দিল মানুষটির স্বভাবচরিত্র—নিরহংকার, নিরাবেগ, নির্ভেজাল।
সরকারি চাকরির পরিসংখ্যানে জয়নাল কুতুবীর কর্মজীবন হয়তো একটি সংখ্যা মাত্র—৩৮ বছর ১৩ দিন। কিন্তু সংখ্যার আড়ালে যে গল্প থেকে যায়, সেটি হলো একজন মানুষের সারাজীবনের নিষ্ঠা, যিনি অর্পিত দায়িত্বকে আদেশ মেনে পালন করে গেছেন দিনের পর দিন। অফিসের চেয়ার-টেবিল ছেড়ে আজ তিনি ঘরে ফিরছেন, কিন্তু সহকর্মীদের স্মৃতিতে রেখে যাচ্ছেন এমন এক অধ্যায়, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
চকরিয়া উপজেলা প্রাণীসম্পদ বিভাগের সেই বিদায়ী সন্ধ্যায় যাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রিয় সহকর্মীর পাশে, তাঁরা জানেন—একজন ভালো অফিসারকে বিদায় দেওয়া যত সহজ, একজন ভালো মানুষকে বিদায় দেওয়া তত সহজ নয়।