
কথায় আছে, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ প্রতিটি শিশু জন্ম নেয় অপার সম্ভাবনা নিয়ে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, আগামী দিনের কাণ্ডারি এবং পথপ্রদর্শক। একটি শিশুর ভেতরে যে সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে থাকে, সঠিক পরিচর্যা ও ভালোবাসার মাধ্যমে তা বিকশিত হলে সেই শিশুই একদিন হয়ে উঠতে পারে দেশ ও জাতির জন্য এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু আমাদের সমাজের বাস্তবতায় অনেক শিশুই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
প্রথমে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের একটি শিক্ষণীয় গল্প দিয়ে বিষয়টি শুরু করা যাক। ছোটবেলায় স্কুলের শিক্ষকরা তাকে অমনোযোগী এবং দুর্বল মেধাসম্পন্ন বলে মনে করতেন। তিনি সহজে কিছু মুখস্থ রাখতে পারতেন না বলে একদিন শিক্ষকরা তাকে একটি চিঠি দিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। চিঠিতে লেখা ছিল যে, এই শিশুটিকে পড়ানোর মতো সক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু তার মা তাকে সেই চিঠির কথা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বুঝিয়ে একটি মিথ্যা আশ্বাস দেন। মা তাকে বলেন যে, শিক্ষকরা তাকে অতিশয় মেধাবী মনে করেন এবং স্কুলের চেয়ে বাড়িতেই তার শিক্ষার ভালো ব্যবস্থা হবে। শুধুমাত্র একজন মায়ের এই অকৃত্রিম অনুপ্রেরণা ও অবিচল বিশ্বাসের কারণে সেই শিশুটির জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। যে ছেলেটিকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই টমাস আলভা এডিসনই পরবর্তীতে বহু ব্যর্থতার পর বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেন এবং পুরো পৃথিবীকে আলোর মুখ দেখান। তিনি তার জীবনে মোট ১০৯৩টি পেটেন্টের অধিকারী হন, যা মানব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। এই গল্পটি প্রমাণ করে যে, শুধুমাত্র পরিবার এবং একজন মায়ের সঠিক অনুপ্রেরণায় একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কত সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে পারে।
ফরাসি সেনাপতি ও রাষ্ট্রনায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব।” এই অমোঘ উক্তিটির মাধ্যমেই বোঝা যায় যে, একটি উন্নত জাতি গঠনে একজন শিক্ষিত মায়ের বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এর উল্টো চিত্র দেখতে পাই। মেয়েদের বয়স একটু বাড়তে না বাড়তেই, অনেক পরিবার তাদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের মতে, ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। সুতরাং একজন শিশুর বিয়ে দেওয়া মানে তার শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করা। অনেক সময় দেখা যায়, ১৩ বা ১৪ বছর বয়সের এক কিশোরী মা নিজেই একটি শিশুর জন্ম দিচ্ছে। এটি যেন শিশুর কোলে আরেক শিশু! যে মায়ের নিজেরই শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্পূর্ণ হয়নি, তিনি কীভাবে তার সন্তানকে একটি সুশিক্ষিত জাতির অংশ হিসেবে গড়ে তুলবেন, তা এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
এবার আসা যাক আমাদের সমাজের এক রূঢ় বাস্তবতা, শিশুশ্রম প্রসঙ্গে। আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে তাকালেই অত্যন্ত করুণ কিছু দৃশ্য চোখে পড়ে। মাত্র ১০ কিংবা ১২ বছর বয়সী ছোট ছোট শিশুদের আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত থাকতে দেখি। তারা লেগুনা বা বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করছে, বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে, কিংবা চায়ের দোকানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ফরমায়েশ খাটছে। এর চেয়েও ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ এবং কলকারখানাগুলোতে, যেখানে এই কোমলমতি শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত মা-বাবা অনেক সময় তাদের শহরের কোনো বিত্তবান পরিবারে কাজের মেয়ে হিসেবে পাঠিয়ে দেন। শুধুমাত্র দুমুঠো ভাতের আশায় এই শিশুরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে। এত পরিশ্রমের পরও অনেক সময় তারা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়, যার সাক্ষী আমরা প্রায়শই বিভিন্ন পত্রিকা বা গণমাধ্যমের খবরে হয়ে থাকি।
অথচ একটি শিশুর জীবন এমন হওয়ার কথা ছিল না। একজন শিশু শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা বা লেখাপড়া দিয়েই যে তার জীবনকে সুন্দর করবে, তা কিন্তু নয়। বর্তমানে প্রতিটি বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি শিশুর মাঝেই কোনো না কোনো বিশেষ প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। তাদের যদি আমরা সঠিক উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে পারি, তবেই তারা নিজেদের মেলে ধরতে পারবে। কাউকে হয়তো বলা যায়, “তুমি তো ফুটবল খেলায় দারুণ দক্ষ,” আবার কাউকে বলা যায়, “তোমার ক্রিকেটের হাত খুব ভালো।” কারো হয়তো কণ্ঠ খুব মিষ্টি, তাকে গানের জন্য উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। আবার কেউ হয়তো ভালো পিয়ানো বাজাতে জানে বা সুন্দর ছবি আঁকতে পারে।
এই সামান্য উৎসাহ এবং সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমে পড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় মনোনিবেশ করে একদিন এই শিশুদের মধ্য থেকেই উঠে আসতে পারে পেলে, রোনালদো, নেইমার কিংবা এমবাপে-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। আর যারা ক্রিকেটে ভালো, তারা সঠিক পরিচর্যা পেলে একদিন হয়ে উঠতে পারে সনাথ জয়সুরিয়া, তামিম ইকবাল, মহেন্দ্র সিং ধোনি কিংবা সাকিব আল হাসান-এর মতো বিশ্ব কাঁপানো অলরাউন্ডার ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার।
যাদের কণ্ঠ সুন্দর এবং গানের প্রতি ঝোঁক আছে, তাদের যদি আমরা বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিই, তবে তাদের মধ্য থেকেই উঠে আসবে সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর, আইয়ুব বাচ্চু কিংবা কিংবদন্তি নগর বাউল জেমস-এর মতো বিখ্যাত সব কালজয়ী শিল্পী।
আর যাদের লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ রয়েছে, দরিদ্রতা যেন তাদের বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। তাদের যদি আমরা একটু আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক বল প্রদান করতে পারি, তবে চরম দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেও তারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে। ঠিক যেমন চরম প্রতিকূলতা পেরিয়ে একজন সাধারণ দুধ বিক্রেতা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ডক্টর আতিউর রহমান। তাদের মধ্য থেকেই জন্ম নিতে পারে জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম-এর মতো দেশবরেণ্য চিকিৎসক। যাদের ছবি আঁকার হাত সুন্দর, তারা সঠিক ক্যানভাস পেলে একদিন বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন-এর মতো খ্যাতি অর্জন করতে পারে। আর যারা উপস্থিত বুদ্ধি ও তর্কবিতর্কে পারদর্শী, তারাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনার জন্য হয়ে উঠতে পারে দূরদর্শী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ।
তাই আসুন, আমরা সবাই আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই। শিশুশ্রমকে ‘না’ বলি। যতটুকু পারি অর্থ দিয়ে, ভালো কথা দিয়ে অথবা নিছক উৎসাহ প্রদান করে এই অবহেলিত শিশুদের পাশে দাঁড়াই। তাদের একটি স্বপ্নময় সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করি। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী প্রজন্ম হোক সম্পূর্ণরূপে শিশুনির্যাতন ও শিশুশ্রম মুক্ত, মাদক মুক্ত এবং কিশোর গ্যাং মুক্ত। আমরা যেন একটি সুস্থ, সুন্দর ও সভ্য জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। পরিশেষে, পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ ও সার্বিক মঙ্গল কামনা করি।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।