সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: সত্যের সন্ধানে যারা আলো জ্বালিয়ে রাখেন

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৮ মে ২০২৬ | ৮:৩৩ অপরাহ্ন


সত্য বলতে গেলে মূল্য দিতে হয়। কখনো চাকরি, কখনো নিরাপত্তা, কখনো ঘুম।

তবু কেউ কেউ বলেন।

আজ শুক্রবার রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এ সেই মানুষগুলোই একসঙ্গে বসলেন— যারা বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্রের শেষ দুর্গ হলো সাহসী সাংবাদিকতা।

যখন অস্ত্র হয় তথ্যের বন্যা

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তৌহিদুল ইসলাম মঞ্চে দাঁড়িয়ে যা বললেন, তা শুনে হয়তো অনেকে চমকে উঠলেন।

তিনি বললেন, সেন্সরশিপের মুখ বদলে গেছে।

আর ইউভাল নোয়া হারারির কথা টেনে বোঝালেন— সত্য অনুসন্ধান করা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ। কিন্তু আধুনিক নিউজরুম এখন সত্যের চেয়ে গতিকে বেশি ভালোবাসে। আর ক্ষমতাবানরা সেই সুযোগটাই নেয়। তারা এখন আর ভয় দেখায় না, অপহরণ করে না— বরং আপনার গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টটি যখন প্রকাশ পায়, তখন তথ্য আর অপতথ্যের এমন এক ঢেউ তৈরি করে যে, সেটি ডুবে যায় নিঃশব্দে।

এরপর তিনি যে কথাটি বললেন, সেটি হয়তো এই সময়ের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন— “কতটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা নয়, বরং কতটি সংবাদ আটকে দেওয়া হয়েছে— তা গণনা করুন।”

সম্পাদক যখন মালিকের পিআরও হয়ে যান

দ্য ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম কথাটা সরাসরিই বললেন।

একজন সম্পাদকের কখনোই মালিকের মুখপাত্র হওয়া উচিত নয়।

কিন্তু বাস্তবতা কী? দুর্নীতিপরায়ণ মানুষেরাই বসে থাকেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আসনে। আর সেখান থেকেই আসে বড় বিজ্ঞাপনের হাতছানি। সেই চাপ সামলানোর দায়িত্ব যার— তিনি সম্পাদক। কিন্তু বাংলাদেশে গণমাধ্যমের যে রাজনীতিকরণ হয়েছে, তাতে শক্তিশালী সম্পাদকীয় ব্যবস্থা গড়েই উঠতে পারেনি।

তবু আশার কথাও বললেন তিনি। সম্পাদক পরিষদ এখন সম্পাদক ও মালিকপক্ষের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি তৈরি করছে। হয়তো এটাই শুরু।

পাকিস্তান থেকে আসা সতর্কবার্তা

পাকিস্তানের দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস একটি কথা বললেন, যা ভেতরে গিয়ে বিঁধে।

সেলফ-সেন্সরশিপ।

সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়ে এটি বেশি বিপজ্জনক। কারণ এটি দেখা যায় না, স্বীকার করা যায় না। সাংবাদিক নিজেই নিজের কলমে রাশ টানেন— আর বাইরে থেকে মনে হয় সব ঠিকঠাক চলছে।

তিনি আরও বললেন, একটি মিডিয়া হাউস তখনই সফল হয়, যখন সম্পাদক আর তার দল পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারেন। বিশ্বাস না থাকলে ভালো সাংবাদিকতা হয় না— শুধু কন্টেন্ট হয়।

টরন্টো স্টার থেকে যে বার্তা এলো

টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বললেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একমাত্র জিনিস যা এক সংবাদ সংস্থাকে আরেকটি থেকে আলাদা করে।

আর যারা এই কাজ করেন, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব মালিক ও ব্যবস্থাপকদের।

তিনি বললেন, “গণতন্ত্রের রক্ষক প্রয়োজন। আর আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ও সম্পাদকরা সেই লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে বীরত্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।”

বিজ্ঞাপনের খাঁচায় বন্দী সংবাদমাধ্যম

যমুনা টিভির ফাহিম আহমেদ বুকে হাত দিয়ে স্বীকার করলেন— আমরা বিজ্ঞাপননির্ভর, আর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

সামান্য বিজ্ঞাপনের আয়ে গোটা এক বছর একটি অনুসন্ধানের পেছনে বিনিয়োগ করা? প্রায় অসম্ভব।

এখানেই চাপা পড়ে যায় অনেক সত্য। শুধু টাকার অভাবে।

শেষে যা মনে থাকে

অধিবেশন সঞ্চালনা করছিলেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। শেষে তিনি মনে করিয়ে দিলেন এই পেশার সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে সত্যিকারের সংজ্ঞা— “সংবাদ হলো তা-ই, যা কেউ কোনো স্থানে চেপে রাখতে চায়। বাকি সব কিছুই বিজ্ঞাপন।”

কনফারেন্স শেষ হবে। আলোচনাও থামবে।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যাবে— যা চাপা পড়ে আছে, তা কি কেউ বের করে আনবেন?