একজন সাংবাদিক দুর্নীতির তথ্য খুঁজছেন। নথিপত্র আছে, প্রমাণ আছে। কিন্তু নেই একটাই জিনিস। ভেতরের মানুষ। যে মানুষটি বলবেন, হ্যাঁ, এটাই সত্য। সেই মানুষটি এখন আর নেই। কারণ, সে নিজেও সুবিধাভোগী।
দ্য হুইসেল সম্পাদক বদরুদ্দোজা বাবু এই গল্পটা বলছিলেন ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এ। বললেন, মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি খুঁজতে গেলে এখন নথিপত্র মেলে, কিন্তু মেলে না ভেতরের কেউ। বড় প্রকল্পে যুক্ত পরামর্শক থেকে শুরু করে দেশের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা মানুষটি পর্যন্ত, প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সুবিধাভোগী। আগে বিশ জনের মধ্যে দুজনকে পাওয়া যেত, যারা সত্য বলতে চাইতেন। এখন সেই মানুষটিও নেই।
২০১৯ সালে হাসপাতাল খাতের দুর্নীতি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে তিনি বললেন, দুর্নীতি হয়েছে সেটা জানানোই সাংবাদিকতা নয়। কেন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, সেটা বের করাই আসল কাজ। কিন্তু সেই পথে এখন আরেকটি বাধা যুক্ত হয়েছে। এক সূত্র তাকে জানিয়েছেন, তিনি আর কোনো সাংবাদিককে নথি দেন না। কারণ, অতীতে যাদের দিয়েছিলেন, তাদের অনেকে নানা চাপে পড়ে প্রতিবেদন আর প্রকাশ করেননি।
বদরুদ্দোজা বাবু বললেন, এটা শুধু কোনো একজন সাংবাদিকের প্রতি অবিশ্বাস নয়। এটা সাংবাদিকতা পেশার প্রতিই মানুষের আস্থা হারানো। আর সেটাই সবচেয়ে উদ্বেগের।
এই গল্পটার পটভূমিটা বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে।
শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলের সম্মেলনকক্ষে পাঁচ শতাধিক মানুষ। সাংবাদিক, সম্পাদক, গবেষক, শিক্ষার্থী। দেশি মুখের পাশে বিদেশি মুখ। দশটি দেশ থেকে এসেছেন অনেকে। আমিও আছি, ফেলো হিসেবে। দুই দিনের এই আয়োজনে বসে মনে হলো, এখানে আসলে একটাই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। সত্য বলার দাম কত?
মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, সংক্ষেপে এমআরডিআই, এ বছর তার ২৫ বছর পূর্ণ করল। রজতজয়ন্তীর আনন্দকে তারা উৎসবে না ঢেলে ঢেলেছে কাজে। আয়োজন করেছে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ১২টির বেশি অধিবেশনে ২০ জন দেশি-বিদেশি আলোচক কথা বলেছেন। আর ৬১ জন সাংবাদিক ফেলো হিসেবে নিজেদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেছেন, যার মধ্যে আমিও একজন।
যে সংকট দেখা যায় না

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একটি সংখ্যা দিয়ে শুরু করলেন। গত এক দশকে সারা পৃথিবীতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৫০০ সাংবাদিক। বাংলাদেশেই ২৬ জন। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, কোথাও রেহাই নেই।
তিনি আরও বললেন, বাংলাদেশ গত ১৭ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে থেকেছে। সেই দীর্ঘ সময়ে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পোষানোর নয়। তারপরও যে আঘাতটি তাকে সবচেয়ে বেশি পীড়িত করে, সেটি ভিন্ন প্রকৃতির। গত বছর ১৮ ডিসেম্বর দেশের দুটি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম, দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা হয়। ইফতেখারুজ্জামান জানালেন, শুধু বাইরের শত্রু নয়, গণমাধ্যমের ভেতরের কিছু পরিচিত মুখও সেই হামলার উসকানিদাতাদের মধ্যে ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ আছে। আর সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর নীরবতা সবাইকে হতাশ করেছে।
ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইস এই মুহূর্তটিকেই সুযোগ হিসেবে দেখতে চাইলেন। বললেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিচারে বাংলাদেশের রেকর্ড গর্বের নয়, কিন্তু এই ক্রান্তিকাল পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মওকাও বটে। গত দুই বছরে অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে, অনেক রিপোর্ট হয়েছে। এখন সময় এসেছে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে হাঁটার।
বৈশ্বিক চিত্রটাও কম উদ্বেগের নয়। গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে জানালেন, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ এখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিচারে ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ পরিস্থিতিতে আছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, গণতন্ত্রের অবক্ষয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অপতথ্য, এই তিন মহাসংকট একসঙ্গে চাপা দিতে চাইছে সত্যিকারের সাংবাদিকতাকে।
সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বললেন, মিথ্যা এখন সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়। প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, অপরিহার্য।
সেন্সরশিপের নতুন মুখ
প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের শিরোনাম ছিল: বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের পথ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। ইউভাল নোয়া হারারিকে উদ্ধৃত করে তিনি বললেন, সত্য অনুসন্ধান করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু আজকের নিউজরুমগুলো সত্যের চেয়ে গতিকে ভালোবাসে বেশি।
তারপর তিনি এমন একটি কথা বললেন, যা পুরো কক্ষকে একটু চুপ করিয়ে দিল। বললেন, সেন্সরশিপের সূত্র বদলে গেছে। তারা এখন আর আপনাকে হুমকি দেয় না, অপহরণ করে না। পরিবর্তে নিশ্চিত করে যে, আপনার অনুসন্ধানটি প্রকাশের পর তথ্য ও অপতথ্যের বন্যায় ডুবে গিয়ে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এটি আধুনিক সেন্সরশিপের সবচেয়ে চালাক কৌশল।
গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থার সংকট প্রসঙ্গে তৌহিদুলের পর্যবেক্ষণটি ছিল ধারালো। বললেন, কতটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা গোনার দরকার নেই, গুনুন কতটি সংবাদ আটকে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে সাংবাদিকতা
পাকিস্তানের দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস বললেন, একটি সংবাদপত্র টিকে থাকে কিসের ওপর ভর করে? উত্তরটা সহজ। তার সম্পাদকীয় দলের স্বায়ত্তশাসন ও সততার ওপর। প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমর্থন তাতে জ্বালানি দেয়। তিনি সতর্ক করলেন, সেলফ-সেন্সরশিপ সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ এটি দৃশ্যমান নয়, স্বীকারযোগ্যও নয়।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বললেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত একটাই, শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান। একজন সম্পাদক কখনোই মালিকের মুখপাত্র হতে পারেন না। দুর্নীতিবাজরা প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসে থাকেন এবং তাদের মাধ্যমেই আসে বড় বিজ্ঞাপন। সেই চাপ সামলানোর দায়িত্ব সম্পাদকের। কিন্তু গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণের কারণে বাংলাদেশে শক্তিশালী সম্পাদকীয় সংস্কৃতি গড়েই উঠতে পারেনি। এই সংকট কাটাতে সম্পাদক পরিষদ এখন সম্পাদক ও মালিকপক্ষের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি তৈরি করছে।
টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বললেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একমাত্র উপাদান, যা এক সংবাদ সংস্থাকে অন্যটি থেকে আলাদা করে। মালিক ও ব্যবস্থাপকদের প্রতি তার আহ্বান ছিল স্পষ্ট। সাংবাদিকদের হয়রানি থেকে রক্ষা করুন। গণতন্ত্রের রক্ষক প্রয়োজন, আর অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরাই সেই লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী ফাহিম আহমেদ স্বীকার করলেন বাস্তব সংকটটা। বিজ্ঞাপননির্ভর গণমাধ্যমের পক্ষে গোটা এক বছর একটিমাত্র অনুসন্ধানের পেছনে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। আলাদা তহবিল নেই, তাই সাহসী সাংবাদিকতার স্বপ্ন দেখাটাও কখনো কখনো বিলাসিতা মনে হয়।
অধিবেশন সঞ্চালনা করছিলেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। সবশেষে তিনি মনে করিয়ে দিলেন এই পেশার সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে সত্যিকারের সংজ্ঞাটি: সংবাদ হলো তা-ই, যা কেউ কোনো স্থানে চেপে রাখতে চায়। বাকি সব বিজ্ঞাপন।
৫৪৭ জনের ভিড়ে একটি প্রশ্ন

সম্মেলনের প্রথম দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বললেন, সরকার গণমাধ্যমকে ‘ইনফরমেশন পার্টনার’ হিসেবে দেখতে চায়। নতুন মাধ্যম ও প্রযুক্তির বিস্তারে গণমাধ্যম এক বড় পরিবর্তনের মুখে, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও সংবাদমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও জানালেন, সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান গণমাধ্যম কমিশন গঠনের কাজে সরকার হাত দিয়েছে। সাংবাদিক সমাজের সহযোগিতা চাইলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, সরকারই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে। মন্ত্রী বললেন, এখন সরকারও নতুন করে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছে। তবে সেই সঙ্গে তিনি এও স্মরণ করিয়ে দিলেন, সাংবাদিক যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়বে।

এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান রজতজয়ন্তীর রাতে একটি নতুন ঘোষণা দিলেন। শিগগিরই চালু হবে বিনামূল্যে অনলাইন ডাটা জার্নালিজম কোর্স, শেষে থাকবে সনদও। তিনি বললেন, ২৫ বছর আগে বলতাম সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করি। আজ বলছি, যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের সঙ্গে কাজ করি। পার্থক্যটুকু ছোট, কিন্তু অর্থটা বড়।
সম্মেলনে একটি তথ্য বেশ মনোযোগ টানল। ৬০টি ফেলোশিপ স্লটের বিপরীতে পিচ জমা পড়েছিল ১৮৮টি। অর্থাৎ অনুসন্ধান করার আগ্রহ আছে, মানুষ আছে। কিন্তু হাসিবুর রহমানের প্রশ্নটি তারপরও থেকে গেল, তাহলে পত্রিকায় বা টেলিভিশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এত কম কেন?
উত্তরটা আসলে সারা সম্মেলনজুড়েই ছড়িয়ে ছিল। বিজ্ঞাপনের চাপ, মালিকের ইচ্ছা, রাজনৈতিক হিসাব, সেলফ-সেন্সরশিপ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা। এই জটিল জালের মাঝে সত্যটুকু বের করে আনতে হলে যা দরকার, সেটা শুধু দক্ষতা নয়, সাহসও।
দুই দিনের সম্মেলনে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ ১০টি দেশের সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। মোট ৫৪৭ জন। এত মানুষের সমাগমের মধ্যে বসেও মনে হচ্ছিল, পুরো আয়োজনটি আসলে একটাই প্রশ্ন বারবার করে গেছে। যে সত্যটা কেউ চেপে রাখতে চায়, সেটা কি বলার সাহস আমাদের আছে?
সম্মেলনকক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় শাকিল আনোয়ারের কথাটা আবার মাথায় এলো। সংবাদ হলো তা-ই, যা কেউ কোথাও চেপে রাখতে চায়।
বাকিটা বিজ্ঞাপন।