
একটি ব্যাংক একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ ঋণ দিতে পারে, সেই সীমায় ব্যাপক শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এখন থেকে একটি ব্যাংক তার মূলধনের ২৫ শতাংশের পুরোটাই ফান্ডেড তথা সরাসরি ঋণ হিসেবে দিতে পারবে। এতদিন এই হার ছিল সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ।
একই সঙ্গে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বা গ্যারান্টিসহ বিভিন্ন নন-ফান্ডেড ১০০ টাকার দায় ফান্ডেড বা সরাসরি ঋণে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এতদিন ৫০ টাকা ধরা হলেও এখন তা ২৫ টাকা ধরা হবে। পাশাপাশি উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা সত্ত্বেও বৃহৎ ঋণ দেওয়ার শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান দুরবস্থার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রথমে এ ধরনের শিথিলতার পক্ষে ছিলেন না।
এ বিষয়ে মতামতের জন্য গত সপ্তাহে ভালো অবস্থানে থাকা কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সেখানে ব্যাংকগুলো একক গ্রাহকের ঋণসীমায় আপাতত শিথিলতা না আনার পক্ষে মত দিয়েছিল।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, এতদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্তের দোহাই দিয়ে বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ মানার চেষ্টা করা হতো। এখন এই শিথিলতার ফলে বড় গ্রাহকরা ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি করবে। ফলে ঋণ শৃঙ্খলা ফেরানোর যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন সহজ করার লক্ষ্যে একক গ্রাহক এবং বৃহৎ ঋণসীমার নীতিমালা শিথিলের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনার আলোকে নন-ফান্ডেড ঋণের ক্ষেত্রে কনভার্সন ফ্যাক্টর বা রূপান্তর হার ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ নির্ধারিত হবে। এই ছাড় পুরোপুরিভাবে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এরপর ধাপে ধাপে ২০৩০ সালের জানুয়ারি থেকে আবার বর্তমানের মতো রূপান্তর হার ধরা হবে। এর মধ্যে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে রূপান্তরের হার ৩০ শতাংশ, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে ৪০ শতাংশ এবং ২০২৯ সালের ডিসেম্বরে ৫০ শতাংশ ধরা হবে। পরের বছরের জানুয়ারি থেকে বর্তমান নির্দেশনা আবার কার্যকর বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইনে একটি ব্যাংক একজন গ্রাহককে তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। কীভাবে সর্বোচ্চ সীমা প্রয়োগ হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দেয়। এতদিনের নির্দেশনায় ফান্ডেড সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এবং নন-ফান্ডেড ১০ শতাংশ দিতে পারবে বলে উল্লেখ ছিল। এখন সেই নির্দেশনায় শিথিলতা আনা হলো।
বৃহৎ ঋণেও বড় ছাড়
একটি ব্যাংক থেকে একক গ্রাহককে তার মোট মূলধনের ১০ শতাংশ বা তার বেশি ঋণ দিলে তা বৃহৎ ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খেলাপি ঋণের হারের ভিত্তিতে মোট ঋণ ও অগ্রিমের কত শতাংশ পর্যন্ত বড় ঋণ দিতে পারবে তা নির্ধারিত থাকে। এ ক্ষেত্রেও ব্যাপক ছাড় দিয়ে উচ্চ খেলাপি ঋণ নিয়েও বড় ঋণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার কম হলে ওই ব্যাংক মোট ঋণের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বৃহৎ ঋণ দিতে পারবে। এতদিন কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশ বা কম হলে তারা ৫০ শতাংশ বড় ঋণ দিতে পারত।
একইভাবে খেলাপি ঋণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হলে ওই ব্যাংকের মোট ঋণের ৪৬ শতাংশ বৃহৎ ঋণ হতে পারবে, যা এতদিন ৩ থেকে ৫ শতাংশ খেলাপি হলে দেওয়া যেত। বর্তমানে ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের একটি ব্যাংক মোট ঋণের ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃহৎ ঋণ দিতে পারত। নতুন নিয়মে খেলাপি ঋণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশের ব্যাংক এ হারে ঋণ দিতে পারবে।
এখন থেকে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ খেলাপি থাকা ব্যাংক মোট ঋণের সর্বোচ্চ ৩৮ শতাংশ বড় ঋণ দিতে পারবে। এতদিন ১০ শতাংশের বেশি তবে ১৫ শতাংশের কম খেলাপি হলে এই সুযোগ ছিল।
খেলাপি ঋণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হলে বড় ঋণ দিতে পারত ৩৪ শতাংশ। এখন খেলাপির হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হলে এ হারে বড় ঋণ দেওয়া যাবে। আর ৩০ শতাংশের বেশি খেলাপির ব্যাংকের মোট ঋণের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হতে পারবে বড় ঋণ। আগে ২০ শতাংশের বেশি খেলাপির ক্ষেত্রে এ হারে বড় ঋণ দেওয়ার সুযোগ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে আনায় এখন ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর আগের নির্দেশনাটি ২০২২ সালে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় পুরো খাতের খেলাপি ছিল ৯ শতাংশের নিচে।