সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জের দায় কেন ভোক্তার?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১৫ মে ২০২৬ | ৮:২৬ অপরাহ্ন


রাত গভীর হলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যে ঘরে ঘুমান, সেখানে হয়তো একটিই ফ্যান ঘুরছে। একটি বাতি জ্বলছে। পাশে পুরনো টেলিভিশনটা বন্ধ। ছোট্ট ফ্রিজে সামান্য বাজার। এটুকুই তাঁদের পৃথিবী। বিলাসিতা নয়, এটুকুই আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে তাঁদের একমাত্র সংযোগ।

অথচ এই মানুষগুলোর ঘরের সেই মিটারের দিকেই এখন তাক করা হয়েছে নতুন একটি তির।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি এবার শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাইছে না, চাইছে পুরো ধাপভিত্তিক বা স্ল্যাব কাঠামোটাই বদলে দিতে। প্রস্তাবটি শুনতে প্রযুক্তিগত মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক নিষ্ঠুর বার্তা। এটি কেবল আরেকটি মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা নয়, এটি বিদ্যুৎ খাতের নীতিগত চরিত্র বদলে দেওয়ার একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ, যার ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সেই মানুষকেই, যিনি মাসের শেষে বিল দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

ধাপের নামে ফাঁদ

বর্তমান কাঠামোয় যিনি কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তিনি কম দামে পান। ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক এবং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রথম ধাপের গ্রাহকেরা তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ কেনেন। এই সুরক্ষাটুকুই তাঁদের টিকে থাকার ছোট্ট ঢাল। এই দুই ধাপে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, কিন্তু নতুন প্রস্তাবের বাকি অংশটুকু সেই ইতিবাচকতাকে ম্লান করে দেয়।

নতুন প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, কেউ যদি ৭৫ ইউনিটের সীমা এক ইউনিটও পেরিয়ে যান, মানে ৭৬ ইউনিট ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁর পুরো ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার উচ্চ হারে হিসাব হবে। অর্থাৎ প্রথম ৭৫ ইউনিটের কম দামের সুবিধা আর পাবেন না। এটি ধাপভিত্তিক সুবিধার মূল দর্শনের সঙ্গেই সরাসরি সংঘাত।

একজন চাকরিজীবী যিনি মাসে ৮০ ইউনিট ব্যবহার করেন, তিনি মাত্র ৫ ইউনিট বেশি ব্যবহার করার কারণে পুরো ৮০ ইউনিটের জন্যই বেশি দাম দেবেন। এই হিসাব কেবল অঙ্কের প্রশ্ন নয়, এটি ন্যায্যতার প্রশ্ন। গরীবকে বাঁচানোর নামে মধ্যবিত্তকে চূর্ণ করার এই কৌশল কোনো সামাজিক ন্যায়বিচারের সংজ্ঞায় পড়ে না।

যাঁদের ওপর বোঝা পড়বে

পিডিবি বলছে, গরিব মানুষের ওপর চাপ না বাড়াতেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকদের একটি বড় অংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাঁরা একটি ফ্রিজ, কয়েকটি বাতি, ফ্যান আর একটি টেলিভিশন নিয়ে সংসার চালান। এগুলো আজকের দিনে বিলাসপণ্য নয়, এগুলো একটি সাধারণ মানবিক জীবনের ন্যূনতম উপকরণ।

এই মানুষগুলোর ওপর প্রতিমাসে বাড়তি আর্থিক চাপ মানে তাঁদের সন্তানের টিফিনের টাকা কাটা যাওয়া, মাসের শেষে বাজার কমিয়ে আনা, অথবা চিকিৎসা খরচ পিছিয়ে দেওয়া। সংখ্যায় যা মামুলি দেখায়, বাস্তব জীবনে তা অনেক ভারী।

এই শ্রেণির মানুষেরা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাঁরা কারখানায় কাজ করেন, স্কুলে পড়ান, অফিসে হিসাব রাখেন, দোকান চালান। তাঁদের সংসার চলে নির্দিষ্ট আয়ে, যেখানে মাসে হঠাৎ কয়েকশো টাকার বিদ্যুৎ বিল বাড়া মানে সংসারের অন্য একটি খাত কমিয়ে আনা। এই শ্রেণির মানুষেরা সরকারি ভর্তুকির সুবিধা পান না, আবার উচ্চবিত্তের মতো বাড়তি খরচ সামলানোর সামর্থ্যও তাঁদের নেই। তাঁরা পড়ে থাকেন দুই চাকির মাঝখানে।

লুকানো নেই যে সত্য

পিডিবি নিজেই হিসাব দিয়েছে, এই স্ল্যাব পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে অতিরিক্ত ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা আয় সম্ভব। উদ্দেশ্য যে রাজস্ব বাড়ানো, তা আর গোপন থাকছে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটের দায় কেন বারবার সাধারণ ভোক্তার কাঁধে এসে পড়ে?

বিগত সরকারের আমলে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হয়েছে, চাহিদার তুলনায় বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে, জনগণের করের টাকায়। এই অপরিকল্পিত ব্যয়ের দায় যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁরা কি কোনো জবাবদিহির মুখে পড়েছেন? তাঁরা কি ফিরিয়ে দিয়েছেন জনগণের লুণ্ঠিত অর্থ? না। বরং সেই অপচয়ের বোঝা এসে পড়ছে সেই মানুষটির কাঁধে, যিনি প্রতিমাসে সময়মতো বিল দেন, কখনো ফাঁকি দেন না।

পাশাপাশি পিডিবির প্রস্তাবে রয়েছে প্রতি ছয় মাসে দাম সমন্বয়ের বিধান, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের কথাও বলা হচ্ছে। তত্ত্বে এটি অর্থনীতির সঠিক ভাষা, কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি মানুষকে অনিশ্চয়তার এক অন্তহীন চক্রে ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি ঝাঁকুনি সরাসরি রান্নাঘরে লাগবে, বাজার থেকে শুরু করে ভাড়াঘরের বিলে। মূল্যস্ফীতির এই চক্র একবার শুরু হলে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সংস্কার আগে, বৃদ্ধি পরে

একটি কথা সবসময় মনে রাখা দরকার, বিদ্যুতের দাম বাড়লে কেবল বিদ্যুৎ বিল বাড়ে না। উৎপাদন খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, ছোট ব্যবসার মুনাফা কমে। একটি বিদ্যুৎ বিলের ঢেউ পুরো অর্থনীতির শরীর বেয়ে নিচে নামে এবং সেই ঢেউয়ের আঘাত সবচেয়ে বেশি লাগে তলার মানুষটির গায়ে।

তাই সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত মূল্যবৃদ্ধির আগে বিদ্যুৎ খাতের ভেতরের দুর্বলতাগুলো দূর করা। অপচয় বন্ধ করা, অদক্ষ চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা, বিতরণ লাইনের অপচয় কমানো, সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে আনা। এই কাজগুলো কঠিন, কিন্তু এগুলোই আসল কাজ। গ্রাহকের পকেট থেকে টাকা তোলা সহজ পথ, কিন্তু সেই পথে যাওয়া মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।

আস্থার সংকট সবার আগে

বিদ্যুতের দাম বাড়লে মানুষ একদম বিরোধিতা করবেন এমন নয়। কিন্তু মানুষ মূল্যবৃদ্ধি তখনই মেনে নেন, যখন দেখেন যে রাষ্ট্রও নিজের অপচয় কমাতে আন্তরিক, অদক্ষতার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আস্থা একটি অদৃশ্য সেতু, যা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। যে ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়, বিনা দরপত্রে চুক্তি হয়, কেন্দ্র বসে থাকলেও ভাড়া যায়, সেখানে নতুন করে সাধারণ মানুষের পকেটে হাত দেওয়া সেই সেতুকে আরও দুর্বল করে।

এই আস্থার সংকট কেবল বিদ্যুৎ খাতের নয়। এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের সংকট। মানুষ যখন বোঝেন যে তাঁদের কষ্টের টাকা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কোনো অজানা চুক্তির অন্ধকারে, তখন তাঁরা কর দিতে অনীহা বোধ করেন, নিয়ম মানতে অনিচ্ছুক হন। এই ক্ষয় একদিনে হয় না, কিন্তু জমতে জমতে একসময় বিস্ফোরণ ঘটায়।

যে পরিবারের রাত কাটে একটি ফ্যানের বাতাসে, তাঁর মিটারের সংখ্যা বাড়ানোর আগে একবার ভাবা দরকার, এই ফ্যানটুকু টিকিয়ে রাখার অধিকার কি তাঁর নেই? রাষ্ট্র যদি সত্যিই সংস্কার চায়, তাহলে সেই সংস্কার শুরু হোক নিজের ঘর থেকে, সাধারণ মানুষের বিল থেকে নয়।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।