
রাত তখন আটটা পেরিয়ে গেছে। ওমানের মরু রাতের আঁধারে একটি গাড়ি থেমে আছে রাস্তার পাশে। ভেতরে চারজন মানুষ। চার ভাই। তাঁদের একজন কাঁপা হাতে ভয়েস মেসেজ পাঠালেন এক আত্মীয়কে। গলার স্বর ভারী, শ্বাস আটকে আসছে। বললেন, শরীর আর সায় দিচ্ছে না। গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো শক্তিও নেই। নাকে-মুখে ফেনা আসছে।
তারপর একটাই অনুরোধ। মায়ের কাছে ফোন করলেন। দোয়া চাইলেন।
সেই দোয়া আর কাজে লাগেনি। ওই রাতেই একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়িতে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় মানুষ পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে দরজা খোলেন। ভেতরে শুধু নিস্পন্দ চারটি শরীর।
রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্দরাজপাড়ার এই চার ভাই ওমানের মাটিতে একসঙ্গে বেঁচেছিলেন। একসঙ্গে মারা গেলেন।
যে গ্যাস দেখা যায় না, গন্ধও নেই
রয়্যাল ওমান পুলিশ তদন্তে নেমে জানিয়েছে, গাড়ি চালু রেখে ঘুমিয়ে পড়ায় এসির এগজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে চার ভাইয়ের। কার্বন মনোক্সাইড এক নির্মম ঘাতক। এই গ্যাসের কোনো রঙ নেই, কোনো গন্ধ নেই। মানুষ বুঝতেই পারে না কখন সে ঘরে ঢুকে গেছে। আবদ্ধ জায়গায় জমতে থাকে, নিঃশব্দে রক্তের অক্সিজেন কেড়ে নেয়, আর মানুষ ঘুমের মধ্যেই ঢলে পড়েন চিরঘুমে।
বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে রওনা হয়েছিলেন মুলাদ্দাহর উদ্দেশে। পথে হয়তো ক্লান্তি এসেছিল। ওমানের গরমে এসি চালু রেখে গাড়িতেই হয়তো একটু জিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই বিশ্রামই হয়ে গেল চিরবিশ্রাম।
মা জানেন না
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এখন এক অদ্ভুত নীরবতা। খাদিজা বেগমের ঘরের ফটকে তালা। বাইরে পৃথিবী জেনে গেছে সব। ভেতরে একজন মা এখনো জানেন, তাঁর চার ছেলে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন।
তিন দিন পেরিয়ে গেছে। মৃত্যুর খবর তাঁর কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ এনাম নিজেই ফটকে তালা দিয়ে রেখেছেন, যাতে প্রতিবেশী বা আত্মীয় কেউ মুখ ফসকে বলে না ফেলেন। মায়ের শরীর আগে থেকেই ভালো নেই। এই ধাক্কা তিনি সামলাতে পারবেন না, এই ভয়ে ছেলে নিজের বুকে পাথর চাপা দিয়ে মায়ের মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কতটা কষ্ট বুকে নিলে একজন মানুষ মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক থাকতে পারেন, তা কল্পনা করতে গেলেও বুকটা ভারী হয়ে যায়।
এনামের বয়স মাত্র বত্রিশ। এই বয়সে চার ভাইকে হারিয়ে মাকে আগলে রাখার এই একাকী লড়াই, এই যন্ত্রণার কোনো ভাষা নেই।
স্বপ্নের সংসার, হঠাৎ ধুলো
খালাতো ভাই এমরান হোসেন বলছিলেন, পরিবারটি এক সময় দরিদ্র ছিল। চার ভাই ওমানে গিয়ে কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল সংসারটি। মায়ের মুখে হাসি ফুটেছিল। বাড়িতে একটু স্বস্তি এসেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত রোদে পরিশ্রম করে যাওয়া সেই চার ভাইয়ের বয়স ছিল পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম বয়স। স্বপ্ন দেখার বয়স। দেশে ফিরে মায়ের পাশে বসার বয়স।
সব শেষ হয়ে গেল এক রাতে। একটি বন্ধ গাড়িতে।
একসঙ্গে যাত্রা, একসঙ্গে ফেরা
চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার বিকেলে একটি ফ্লাইটে একসঙ্গে চার ভাইয়ের মরদেহ দেশে পাঠানো হবে। বাংলাদেশ দূতাবাস, চট্টগ্রাম সমিতি ওমান এবং স্বজনেরা মিলে এই প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন। যেহেতু এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, তাই লাশ পাঠানোর ব্যয় ওমান সরকার নেবে না। সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন স্বজন ও সমিতির নেতারা।
রাঙ্গুনিয়ার কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হবে। যেভাবে একসঙ্গে বেঁচেছিলেন, যেভাবে একসঙ্গে মারা গেলেন, সেভাবেই পাশাপাশি শুয়ে থাকবেন চিরকাল।
একটি সতর্কবার্তা যেন আর কাউকে না হারাতে হয়
এই ট্র্যাজেডির পর রয়্যাল ওমান পুলিশ সবার উদ্দেশে সতর্কবার্তা জারি করেছে। গাড়ি চালু রেখে আবদ্ধ অবস্থায় ঘুমানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই সতর্কতা বিশেষভাবে জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচণ্ড গরমে গাড়িতে এসি চালিয়ে ঘুমানো অনেকের অভ্যাস। কিন্তু গাড়ির কোনো ত্রুটি বা বায়ু চলাচলের সমস্যা থাকলে এই অভ্যাসই হয়ে উঠতে পারে মরণফাঁদ।
রাশেদুল, শাহেদুল, সিরাজুল ও শহিদুলের মৃত্যু যেন অন্তত আরও একটি পরিবারকে এই অন্ধকারে পড়তে না দেয়।
আর রাঙ্গুনিয়ার সেই ঘরে মা খাদিজা বেগম এখনো অপেক্ষায় আছেন। ছেলেরা হাসপাতালে সুস্থ হচ্ছেন, একদিন ফিরবেন। এই বিশ্বাসটুকু নিয়েই হয়তো প্রতিটি ভোর পার করছেন তিনি।
কিন্তু যে মঙ্গলবার ছেলেরা ফিরবেন, সেদিন তাঁরা আসবেন কাঠের বাক্সে। আর সেই সত্য বুকে লুকিয়ে রাখা এনামের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত এখন এক নিঃশব্দ কান্নার নাম।