সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

লাল চিনির আড়ালে বিষের বাণিজ্য

কেজিতে নব্বই টাকা লাভ, বিনিময়ে ক্যানসার
শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ১৭ মে ২০২৬ | ৯:৫৪ অপরাহ্ন


মা ভাবছেন সন্তানের জন্য ভালো কিছুই করছেন। বাজার থেকে একটু বেশি দাম দিয়ে কিনে এনেছেন লাল চিনি। প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে প্রাকৃতিক, স্বাস্থ্যকর, আখের তৈরি। শিশুর দুধে, সেমাইয়ে, চায়ে মেশাচ্ছেন সেই চিনি। ভাবছেন কৃত্রিম কিছু খাওয়াচ্ছেন না।

কিন্তু সত্যিটা ঠিক উল্টো।

সেই প্যাকেটের ভেতরে আছে সাধারণ সাদা চিনি, তার সঙ্গে মেশানো হয়েছে টেক্সটাইল কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক রং। যে রং কাপড়ে লাগানোর জন্য তৈরি, সেই রং এখন ঢুকে যাচ্ছে শিশুর পেটে। আর মা জানতেও পারছেন না, ভালো করার চেষ্টায় তিনি প্রতিদিন একটু একটু করে বিষ খাওয়াচ্ছেন নিজের সন্তানকে।

এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়। বাংলাদেশের বাজারে এখন এই ভয়ংকর প্রতারণা চলছে প্রকাশ্যে।

রঙের প্রলোভন, বিষের ব্যবসা

লাল চিনি বা ব্রাউন সুগার নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক দিন ধরেই। প্রাকৃতিক, কম প্রক্রিয়াজাত, স্বাস্থ্যকর এই ধারণাটি বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয়। সচেতন মানুষেরা তাই সাদা চিনি এড়িয়ে লাল চিনির দিকে ঝুঁকছেন। আর এই সচেতনতাকেই হাতিয়ার বানিয়েছে অসাধু একটি চক্র।

পদ্ধতিটি সরল কিন্তু ভয়ংকর। বাজার থেকে কিনে নেওয়া হয় সস্তা সাদা চিনি। তারপর তাতে মেশানো হয় লাল বা গাঢ় বাদামি রাসায়নিক রং। দানাগুলো আসল লাল চিনির মতো আঠালো ও দলা পাকানো দেখাতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল। প্যাকেটের গায়ে নকল করা হয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনসহ বড় ব্র্যান্ডের মোড়ক। অনুমোদন না থাকলেও বসানো হয় বিএসটিআইয়ের লোগো। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই।

তারপর সেই চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে। অথচ সাদা চিনি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। প্রতি কেজিতে ৭০ থেকে ৯০ টাকা লাভ। কেবল একটু রং মিশিয়ে।

শরীরের ভেতরে যা ঘটছে

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা সরাসরি মানুষ মেরে ফেলার কাজ করছে। বাড়িয়ে বলা নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানই এটা বলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ জানাচ্ছেন বিস্তারিত। কৃত্রিম লাল রং তৈরিতে প্রায়ই এরিথ্রোসিন বা রেড ডাই-৩-এর মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে থাইরয়েড টিউমারসহ বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। রক্তচাপ বাড়ে, হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। হজমক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়, গ্যাস্ট্রিক ও পেটব্যথা লেগেই থাকে। ত্বকে অ্যালার্জি, র‍্যাশ বা চুলকানি দেখা দেয়।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের জায়গাটা অন্যত্র। শিশুদের উপর এই রাসায়নিকের প্রভাব বড়দের চেয়ে বহুগুণ বেশি। কৃত্রিম রঙের প্রভাবে শিশুদের মধ্যে অতিসক্রিয়তা বাড়তে পারে, মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যে মা সন্তানের জন্য সুস্থ খাবার ভেবে লাল চিনি কিনছেন, তিনি আসলে সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশকেই বিপদে ফেলছেন।

বাজারে যা দেখা গেল

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ একাধিক বাজার তদারকি সংস্থা অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছে। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল জানাচ্ছেন, বাংলাদেশ চিনিশিল্পের লাল চিনির আদলে সাদা চিনিতে টেক্সটাইল রং ব্যবহার করে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হচ্ছিল। এসব প্যাকেটে কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, কোনো উৎপাদনকারীর পরিচয় নেই। ধরা পড়লে গুটিয়ে নেওয়া যায়, নতুন নামে আবার শুরু করা যায়।

বহদ্দারহাট বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলছেন আরও চমকে দেওয়া কথা। সরকারি সংস্থার লাল চিনি এখন বাজারে সরবরাহ হচ্ছে না। কিন্তু প্রতিটি দোকানে লাল চিনির প্যাকেট সয়লাব। এই চিনি কোথা থেকে আসছে? উত্তর স্পষ্ট।

জরিমানার পরও থামছে না অসাধুরা

ক্যাবের নাজের হোসাইনের হতাশাটা বোঝা যায়। তদারকি সংস্থাগুলো অভিযান চালাচ্ছে, ধরছেও। কিন্তু শাস্তি হচ্ছে সামান্য জরিমানা। আর ৭০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে মুনাফা করা ব্যবসায়ীর কাছে সেই জরিমানা কিছুই না। তাই ধরা পড়লেও ব্যবসা থামছে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন জানিয়ে দিয়েছে, তারা ডিলারদের শুধু খোলা অবস্থায় চিনি বিক্রির অনুমতি দেয়, প্যাকেজিং করার অধিকার নেই। তারপরও যারা মোড়ক নকল করে বাজারে ছাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু ততক্ষণে কত পরিবার এই বিষ খেয়ে ফেলেছে? কত শিশুর শরীরে কত কেমিক্যাল জমে গেছে? সেই হিসাব কে রাখছে?

সাবধান থাকবেন যেভাবে

সাধারণ ভোক্তার পক্ষে পরীক্ষাগারে না গিয়ে আসল-নকল বোঝার উপায় কম। তবু কিছু সতর্কতা নেওয়া যায়। প্যাকেটে উৎপাদনকারীর ঠিকানা ও বিএসটিআই নম্বর যাচাই করুন। সরকারি সংস্থার নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে কিনুন। অস্বাভাবিক কম বা বেশি দামে সন্দেহ করুন। সন্দেহজনক পণ্য পেলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন।

কিন্তু সত্যিকারের সমাধান ভোক্তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যে চক্র মানুষের থালায় বিষ মেশাচ্ছে, তাদের কঠোর শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত এই অপরাধ থামবে না। জরিমানা নয়, জেল চাই। উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

কারণ প্রতিটি চায়ের কাপে যে চিনি পড়ছে, তার সঙ্গে যদি বিষও পড়ে, তাহলে সুস্থ থাকার কোনো উপায় নেই এই দেশে।