
রাত তখন পৌনে দশটা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে লোহাগাড়ার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের পাশ দিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশা এগিয়ে যাচ্ছিল। ভেতরে বসে আছেন দুই তরুণ সহপাঠী। কিছুক্ষণ আগেই বটতলী মোটর স্টেশনের কাজ সেরে মাদরাসায় ফিরছিলেন তাঁরা। হয়তো কথা হচ্ছিল, হয়তো ক্লান্ত চোখে রাতের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তারপর একটা মুহূর্ত। বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা হানিফ পরিবহনের বাস। মুখোমুখি সংঘর্ষ। প্রচণ্ড ধাক্কায় ছিটকে পড়লেন তামিম। মাথায় গুরুতর আঘাত।
মোস্তাকিম কামাল তামিমের বয়স ছিল মাত্র বাইশ বছর।
যে ছেলেটি আর ফিরল না
কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার হালকাকারা এলাকায় রাশেদ কামালের সংসারে তামিম ছিলেন আলোর টুকরো। আধুনগর ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন। মাদরাসার আবাসিক হলেই থাকতেন, পড়াশোনায় মনোযোগী।
মাদরাসার অধ্যক্ষ খালেদ জামিল বলছিলেন ছাত্রটির কথা। তাঁর ভাষায়, তামিম খুবই ভদ্র, নম্র ও মেধাবী ছাত্র ছিল। সহজ কথা, কিন্তু এই কথাগুলোর ভেতরে একটি পরিপূর্ণ মানুষের ছবি আঁকা।
সেই রাতে (১৭ মে) ব্যক্তিগত কাজে বটতলী মোটর স্টেশনে গিয়েছিলেন তামিম ও তাঁর এক সহপাঠী। কাজ শেষে সিএনজিতে চড়ে মাদরাসায় ফিরছিলেন। ফেরা আর হলো না।
স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে ছুটতে হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
জানাজায় কান্নার রোল
সোমবার (১৮ মে) সকাল দশটা। চকরিয়ার হালকাকারা গ্রাম। তামিমের বাড়ির উঠানে জানাজার প্রস্তুতি। কিন্তু সেই উঠানে শোকের যে ঢেউ উঠেছিল, তা ভাষায় বলা কঠিন।
স্বজনদের আহাজারি, মায়ের কান্না, বাবার নিঃশব্দ বেদনা। মাদরাসা থেকে ছুটে আসা সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। যার সঙ্গে গতকালও একই আবাসিক হলে ছিলেন, একই ক্লাসে বসে পড়েছেন, একসঙ্গে খেয়েছেন, সে আজ কাঠের খাটিয়ায়।
জানাজা শেষে গ্রামের মাটিতে চিরঘুমে শুইয়ে দেওয়া হলো তামিমকে।
রাস্তা কেড়ে নিচ্ছে কতজনকে
তামিমের এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক বছরের পর বছর ধরে প্রাণ গিলে চলেছে। রাতের বেলা বেপরোয়া গতি, মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন। এই মহাসড়কে প্রতিটি দুর্ঘটনায় যে পরিবার ভাঙে, সে পরিবারের কান্না আর পরিসংখ্যানে ওঠে না।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে, আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। প্রতিবারই এই কথা বলা হয়। তারপরও প্রতিদিন রাতে কেউ না কেউ ঘর থেকে বের হন এবং আর ফেরেন না।
তামিম কামিল পাস করে একদিন ঘরে ফিরতেন। বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতেন। সে স্বপ্ন এখন মাটির নিচে।
বাইশ বছরের একটি জীবন শেষ হয়ে গেল একটি রাতের একটি মুহূর্তে। মহাসড়কের পিচঢালা পথে রয়ে গেল শুধু একটি নাম, মোস্তাকিম কামাল তামিম।