
সোমবারের বিকেলটা লোহাগাড়ার জন্য স্বাভাবিক ছিল না। ঘড়ির কাঁটা তিনটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে মাত্র দেড় ঘণ্টায় তিনটি পরিবার হারাল তাদের প্রিয়জনকে। একটি শিশু, একজন তরুণ আর একজন মা। তিনটি আলাদা জায়গা, তিনটি আলাদা ঘটনা, কিন্তু একটাই পরিণতি।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা সোমবার (১৮ মে) বিকেলে তিনবার কাঁদল।
পুকুরের ঘাটে থেমে গেল ছোট্ট জীবন
বিকেল চারটা বিশ মিনিট। চরম্বা ইউনিয়নের মাইজবিলা দক্ষিণ পাড়ায় তখন দিনের শেষ আলো নরম হয়ে আসছে। নয় বছরের আলিফা প্রাইভেট পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। মাইজবিলা রহমানিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণির এই ছাত্রী প্রতিদিনের মতোই পুকুরঘাটে পা ধুতে নামল।
তারপর একটুখানি অসাবধানতা। পা পিছলে গেল। ঠান্ডা পানিতে হারিয়ে গেল ছোট্ট একটি শরীর।
কিছুক্ষণ পর গোসল করতে আসা ছেলেরা পানিতে নামলে পায়ে কিছু একটা ঠেকল। তুলে আনা হলো আলিফাকে। ছুটে গেল পরিবার। ছোটানো হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু চিকিৎসক যা বললেন, তা শুনতে কেউ প্রস্তুত ছিলেন না।
আলিফা আর নেই।
প্রবাসী বাবা আরিফ উদ্দিন দেশের বাইরে বসে কোন মুহূর্তে এই খবর পেলেন, তা ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে যায়। মেয়েটি প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিল। ফিরে আসেনি।
নলকূপ বসাতে গিয়ে ঝরে গেল উনিশের তারুণ্য
একই দিন, বিকেল সাড়ে চারটা। উপজেলার সদর ইউনিয়নের লিয়াকত মেস্ত্রীর বাড়িতে কাজ করছিলেন উনিশ বছরের মোহাম্মদ সাকিব। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ভরিপুর এলাকার এই তরুণ নলকূপে বৈদ্যুতিক মোটর বসাচ্ছিলেন।
কাজের মধ্যেই বিদ্যুৎ স্পর্শ করল তাঁকে। মুহূর্তেই সব শেষ।
উনিশ বছর বয়স। জীবনটা সবে শুরু হচ্ছিল। বান্দরবান থেকে এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। হয়তো পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল। ভরিপুরের সেই পরিবার এখন অপেক্ষায় আছে, ছেলে কবে ফিরবে। কিন্তু যে খবর তাদের কাছে পৌঁছেছে, তা ফেরার খবর নয়।
রান্নাঘরের পাশে মোটর চালাতে গিয়ে তিন সন্তানের মা চলে গেলেন
বিকেল তিনটা। কলাউজান ইউনিয়নের কানুনারাম বাজারের উত্তরে সর্দার পাড়া। পারভীন আকতার রান্নাঘরের পাশে পানির মোটর চালু করতে গেলেন। তিন সন্তানের এই মা হয়তো ভাবছিলেন রাতের রান্নার কথা, সন্তানদের কথা।
মোটরের সুইচে হাত দিতেই বিদ্যুৎ ছুঁয়ে গেল তাঁকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন পারভীন। পরিবারের সদস্যরা ছুটে এলেন, তুলে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী পারভীন আর ফিরলেন না। স্বামী নুরুচ্ছাফার সংসারে তিন সন্তান রয়ে গেল মাকে ছাড়া।
একটি বিকেলের হিসাব
তিনটি মৃত্যু। তিনটি পরিবারে ভাঙন। একটি শিশু যে আর স্কুলে যাবে না, একজন তরুণ যে বাড়ি ফিরবে না, একজন মা যে সন্তানদের মুখ আর দেখবেন না।
বিদ্যুৎ আর পানি। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুটি অপরিহার্য সঙ্গী। অথচ সামান্য অসাবধানতায় এই দুটিই হয়ে ওঠে মৃত্যুর দূত। বাড়ির পুকুর, রান্নাঘরের মোটর, নলকূপের বৈদ্যুতিক সংযোগ। এগুলো প্রতিদিনের চেনা জিনিস। কিন্তু এই চেনা জিনিসগুলোই সোমবারের সেই বিকেলে কেড়ে নিল তিনটি প্রাণ।
লোহাগাড়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে আজকের সন্ধ্যায় আলো জ্বললেও তিনটি ঘরে নেমে এল চিরন্তন অন্ধকার।