সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পকেটের টাকায় চলে তদন্ত, ঘুষে চলে সংসার

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৯ মে ২০২৬ | ১১:৫১ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে সেদিন ভোরবেলা ভেসে উঠেছিল একটি অর্ধগলিত লাশ। পুলিশের দায়িত্বরত এসআই খবর পেয়ে ছুটলেন। লাশ তুলতে হবে, ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু সরকারি কোষাগারে এই কাজের জন্য এক টাকাও বরাদ্দ নেই।

নিজের পকেট থেকে তিন হাজার টাকায় একজন ডোম ভাড়া করলেন। অ্যাম্বুলেন্সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিতে লাগল আরও চার হাজার। মর্গের ডোমকে দিতে হলো এক হাজার। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় লাশটি দাফনের জন্য দেওয়া হলো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে।

মোট খরচ আট হাজার টাকা। সবটাই গেল সেই এসআইয়ের নিজের পকেট থেকে।

এই একটি ঘটনা নয়। গত এক বছরে চট্টগ্রামের ওই কর্মকর্তাকে এমন বেশ কয়েকটি লাশ ব্যবস্থাপনা করতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খরচ পড়েছে পনের হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, বেতন পাই মাত্র পঁয়তাল্লিশ থেকে ছেচল্লিশ হাজার টাকা। চাকরি ঠিক রাখতে টাকা ম্যানেজ করতে হয়। কখনো কখনো ওসিও টাকাটা দেন।

বরাদ্দ আর বাস্তবতার মধ্যে পাহাড়সমান ফারাক

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০২১ সালে মামলার তদন্ত ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। কাগজে-কলমে হত্যা মামলার তদন্তে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছয় হাজার টাকা। অপহরণ বা মানব পাচার মামলায় পাঁচ হাজার। দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলায় চার হাজার। সন্ত্রাসবিরোধী বা অস্ত্র মামলায় তিন হাজার। ধর্ষণ বা মাদক মামলায় মাত্র দুই হাজার।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

চট্টগ্রামের একটি থানায় সম্প্রতি একটি হত্যা মামলার তদন্ত করেছেন একজন এসআই। সাক্ষী খোঁজা, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ, বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত মিলিয়ে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। সরকার দিয়েছে ছয় হাজার। বাকি চৌদ্দ গুণ টাকা কোথা থেকে এল? সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু উত্তরটা সবারই জানা।

মানি লন্ডারিং মামলায় বরাদ্দ তিন হাজার, অথচ তদন্তে খরচ বিশ থেকে পঁচিশ হাজার। অপহরণ মামলায় ভিকটিম উদ্ধারে লাগে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার, বরাদ্দ মাত্র পাঁচ হাজার। প্রতিটি মামলায় বাকি টাকা ‘ম্যানেজ’ হয় অন্য পথে।

ওপেন হাউজ ডে, পকেট থেকে চাঁদা

চট্টগ্রামের একটি থানায় সম্প্রতি ‘ওপেন হাউজ ডে’ আয়োজন করা হয়। স্থানীয় একটি কমিউনিটি হলে বিভিন্ন পেশার মানুষ আমন্ত্রণ জানানো হয়। স্টেজ সাজানো, ফুল আর নাস্তা বাবদ খরচ হয়েছে দশ থেকে বারো হাজার টাকা।

এমন অনুষ্ঠানের জন্য পুলিশকে এক টাকাও বরাদ্দ দেওয়া হয় না।

থানার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানালেন, কমিউনিটি হল বিনা ভাড়ায় পাওয়া গেছে। বাকি খরচ সব অফিসার মিলে নিজেদের পকেট থেকে দিয়েছেন। অনুষ্ঠানটি হয়েছে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য। কিন্তু সেই জনসেবার টাকাও যোগাতে হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে।

সোর্স মানি যায় সিনিয়রের পকেটে

চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় কর্মরত একজন এসআই জানালেন গোপন এক সত্য। তদন্তের কাজে অপরাধী শনাক্তে সোর্স নিয়োগ করতে হয়। সেই সোর্সকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়। সরকারিভাবে এই খাতে ‘সোর্স মানি’ বরাদ্দ আছে। কিন্তু সেই টাকা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায় না।

কারণটা সহজ। সোর্স মানির বরাদ্দ আটকে যায় সিনিয়র কর্মকর্তাদের স্তরে।

ফলে মাঠের এসআই নিজের টাকায় সোর্স চালান। আর সেই টাকা জোগাড় করতে অনিচ্ছায় হলেও ঢুকে পড়েন দুর্নীতির চক্রে।

গাড়ি নেই, অভিযানে যান কীভাবে

চট্টগ্রামের একটি থানায় রাতে নয়টি টহল টিম নামে। কিন্তু থানায় গাড়ি আছে মাত্র তিনটি। বাকি ছয়টি টিম কীভাবে টহল দেয়? উত্তর হলো ‘ম্যানেজ’।

কখনো ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল, কখনো ভাড়ার গাড়ি, কখনো অভিযোগকারী বাদীর কাছ থেকে নেওয়া যানবাহন। চট্টগ্রামের বাইরে অভিযানে গেলে যদি দশ হাজার টাকা খরচ হয়, বিল পাওয়া যায় চার হাজার। অনেক সময় সেটুকুও মেলে না। বাকি টাকা কোথা থেকে আসে? বাদীর পকেট থেকে, না তদন্ত কর্মকর্তার দুর্নীতি থেকে, সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে চান না।

পদায়নেও লাগে টাকা

চট্টগ্রামের পুলিশ মহলে একটি কথা প্রচলিত আছে, ভালো থানায় পোস্টিং পেতে হলে টাকা লাগবে। ওসি হতে চাইলে বিশ থেকে ত্রিশ লাখ (কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি), এসআই হতে দুই থেকে আড়াই লাখ, কনস্টেবল পদায়নে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ।

এই টাকা দিয়ে পদায়ন নেওয়া মানে চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই কোটিপতির স্বপ্ন ভেঙে ঋণের জালে আটকে যাওয়া। আর সেই ঋণ শোধ করতে শুরু হয় আসল দুর্নীতি।

চট্টগ্রামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, কনস্টেবল পদে চাকরি নিতেই লাখ টাকা ধার করতে হয়েছে। সেই টাকা তুলতে না পারলে সংসার চলবে কী দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেকে ঢুকে পড়েন দুর্নীতির অন্ধকারে।

৭৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির মুখোমুখি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জরিপ বলছে, পুলিশের সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। ঘুষ দিয়েছেন ৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপেও দেখা গেছে পুলিশি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে ৬২ শতাংশ মানুষকে।

চট্টগ্রামের একজন সাধারণ নাগরিক বললেন, থানায় মামলা করতে গেলে টাকা লাগে, তদন্ত করাতে গেলে টাকা লাগে। টাকা না দিলে কাজ হয় না। এই বিশ্বাস এখন শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্র।

সমস্যার গোড়ায় রাষ্ট্রের অবহেলা

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলছেন, পুলিশকে যদি সৎ ও দক্ষ রাখতে হয়, তাহলে এই আর্থিক সংকট আগে সমাধান করতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের বাস্তব খরচ দিতে হবে, নিজের পকেট থেকে যেন এক টাকাও না লাগে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন আরও স্পষ্ট কথা। পুলিশের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নগণ্য, অনেক ক্ষেত্রে শূন্য। এই শূন্যতাই দুর্নীতির জন্ম দিচ্ছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে এই সমস্যা চিরকাল জিইয়ে থাকবে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, পুলিশের কাছে গাড়ি নেই, যোগাযোগের সুবিধা নেই। তখন সে অভিযোগকারীকে বলে সিএনজির ভাড়া দাও, তারপর যাব। পুলিশকে পুলিশের মতো না রাখলে মনোবলও তেমনই থাকবে।

একজন তরুণ এসআই হতাশা নিয়ে বললেন, চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম সততার সঙ্গে কাজ করব বলে। কিন্তু সিস্টেমটা দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।

এই একটি বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে বড় সংকটের সার কথা। সমস্যাটা শুধু ব্যক্তির নয়, সমস্যাটা পুরো ব্যবস্থার। আর ব্যবস্থা না বদলালে ব্যক্তি বদলায় না, দুর্নীতিও বন্ধ হয় না।