
বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টানা তিন বছর ধরে মন্থর প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে অব্যাহত নিম্নমুখিতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে কঠোর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সরকারকে কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর বাইরে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কোনো অবস্থা বর্তমানে নেই।
সোমবার বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: স্পেশাল ফোকাস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ওপর তৈরি বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। পিআরআইয়ের সভাপতি জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রতিবেদনটি নিয়ে দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চড়া মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে সংকট, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে নিম্নমুখিতা ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর মাধ্যমে টানা তৃতীয় বছরের মতো অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিফলন ঘটছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকের মধ্যে একটি নাজুক সময়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে, যা আগের ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে একটি বড় বিচ্যুতি।
সেমিনারে আলোচকরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বর্তমানে চারটি বিষয় প্রকট আকার ধারণ করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে চলে যাওয়া। এ ছাড়া শিল্প খাতের পাশাপাশি কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও হ্রাস পাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বৈদেশিক খাতে অব্যাহত চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়ার নীতিগত ব্যবস্থা খুবই সীমিত। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি দরিদ্রতা বাড়ছে। অব্যাহত অর্থনৈতিক মন্দা ইতিমধ্যেই মানুষের জীবনযাত্রার মানকে নিম্নমুখী করেছে। এমন অবস্থায় আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি বৃদ্ধির হার নিম্ন পর্যায়ে থাকার কারণে মানুষের প্রকৃত আয় নেতিবাচক পর্যায়ে চলে গেছে। ফলে ২০১৮ সালে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, সেখান থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে তা ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। পাশাপাশি চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের আয় কমে যাবে, যা দারিদ্র্য হ্রাসের প্রক্রিয়াকে আরও স্থবির করে দিতে পারে। কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করার পরও মূল্যস্ফীতির হার কমছে না।
আলোচনায় বক্তারা মূল্যস্ফীতি না কমার পেছনে পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, দাম বৃদ্ধি ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে নিম্ন আয়ের ও অদক্ষ শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি নেতিবাচক হয়ে পড়েছে, যা তাদের পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
আলোচকরা মুদ্রানীতি শিথিল করার বিষয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করে দুর্নীতি রোধ, কাঠামোগত সংস্কার চলমান রাখা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা দূর করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাত অর্থনৈতিক চাপের কারণে আরও গভীর সংকটে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্তিমিত হওয়ায় ব্যাংকের গতিশীলতা হ্রাস পেয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের মান কঠোর করায় এবং কয়েকটি ব্যাংক পুনর্গঠন করার উদ্যোগের ফলে খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সম্পদের গুণগত মানও কমেছে। ব্যাংকগুলোর এই আর্থিক দুরবস্থা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করেছে।
ব্যাংক খাতের অব্যাহত দুর্বলতা রোধে জরুরি ভিত্তিতে মূলধনের জোগান বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণ দ্রুত কমানো, তদারকি বাড়ানো এবং সুশাসন ব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, রাজস্ব আয় গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। রাজস্ব আয় দুর্বল হয়ে পড়ায় সামাজিক খাতে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।