
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটাই স্বপ্ন দেখছিলেন। বদিউল আলম সড়কটা ঠিক হবে। প্রতিদিন কাদা মাড়িয়ে, গর্তে পা পিছলে যে পথে চলতে হয়, সেই পথটা একদিন মসৃণ হবে। দশ হাজার মানুষের যাতায়াতের এই রাস্তায় আলো আসবে।
অবশেষে বরাদ্দ এলো। কার্যাদেশ হলো। কাজও শুরু হলো।
কিন্তু কাজ শুরু হতে না হতেই স্বপ্নে ফাটল ধরল।
সাগরের বালুতে রাস্তা, ক্ষোভে ফুটছে এলাকা
স্থানীয় বাসিন্দারা চোখের সামনে দেখলেন, জলকদর খালে বলগেট থেকে নামানো হচ্ছে বালু। সাগর থেকে আনা লবণাক্ত বালু। যে বালু দিয়ে রাস্তা হলে কংক্রিট টেকে না, কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়, বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়।
সমদ আলী সিকদার বাড়ি, হিন্দু পাড়া, দৌল্লার বাড়ি, আলিছন বাড়ি, কাদের বক্সের বাড়িসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ একসঙ্গে প্রতিবাদে নামলেন। জানতে চাইলেন, কী হচ্ছে এখানে?
জবাবে ঠিকাদার হুমকি দিলেন, কাজ ফেলে চলে যাব।
স্থানীয় বাসিন্দা হেফাজ উদ্দিন মানিক নিজেই ভিডিও করে পাঠালেন এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলীকে। দেখালেন, কীভাবে লবণাক্ত বালু ঢালা হচ্ছে রাস্তায়। অভিযোগ শুধু বালুতেই নয়। যেখানে ম্যাগাটন ব্যবহারের কথা ছিল, সেখানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র দুই ফুট বালি। কংক্রিটও সঠিকমতো পড়ছে না।
কাগজে আছে একটি মান। মাঠে চলছে আরেকটি খেলা।
৮৪ লাখ টাকার প্রকল্প, মান কোথায়?
উপজেলা এলজিইডি অফিস জানাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বদিউল আলম সড়কের ৮০০ মিটার সংস্কারে বরাদ্দ হয়েছে ৮৪ লাখ ৬২ হাজার ২০৫ টাকা। কার্যাদেশ পেয়েছে বাপ্পী এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
৮০০ মিটার রাস্তায় ৮৪ লাখ টাকা। এই টাকায় মানসম্পন্ন কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু মাঠে যা হচ্ছে, তা দেখে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, টাকাটা তাহলে যাচ্ছে কোথায়?
বাঁশখালী উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফরাদ বিন মুনীর বলছেন, লবণাক্ত বালু ব্যবহারের সুযোগ নেই। কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ বুঝে নেওয়া হবে। অভিযোগ পেয়ে সরেজমিন উপ-প্রকৌশলীকেও পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেই উত্তর এখনো মেলেনি।
ঠিকাদারের নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকে দেওয়া অংশ হলো ঠিকাদার বাপ্পীর নিজের কথা।
অনিয়মের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, বাংলাদেশে কোন জায়গায় লবণাক্ত বালু ছাড়া কাজ হচ্ছে বলেন? সব জায়গায় লবণাক্ত বালু দিয়ে কাজ হচ্ছে। এখন তো লবণাক্ত বালুও পাওয়া যাচ্ছে না।
এই একটি বাক্যে তিনি যা বললেন, তা শুধু নিজের অনিয়মের স্বীকারোক্তি নয়। এটি একটি পচা ব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন। সারা দেশে যে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে রাস্তা হচ্ছে, সেটা এখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে ঠিকাদার নিজেই মনে করছেন, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই।
তাঁর আরেকটি যুক্তি, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জিনিসপত্রের দাম বেশি। এটা লোকসানের প্রকল্প। তবুও এলাকার মানুষের কষ্টের কথা ভেবে কাজ করছেন।
বিশ্বের ভূরাজনৈতিক যুদ্ধের দায় চাপিয়ে বাঁশখালীর রাস্তায় লবণাক্ত বালু ঢালার এই যুক্তি শুনে এলাকাবাসী কী ভাবছেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
দশ হাজার মানুষের প্রশ্ন
গণ্ডামারার ওই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন দশ হাজার মানুষ চলাচল করেন। কৃষক যান মাঠে, শিক্ষার্থী যায় স্কুলে, রোগী যায় হাসপাতালে। দীর্ঘদিনের অবহেলার পর যখন বরাদ্দ এলো, তখন তাঁরা ভেবেছিলেন এবার হয়তো পথের কষ্ট শেষ হবে।
কিন্তু লবণাক্ত বালুর রাস্তা কতদিন টিকবে? এক বর্ষায় ধুয়ে গেলে কি আবার আরও ৮৪ লাখ টাকা আসবে? আবার কি একই ঠিকাদার একই বালু দিয়ে একই কাজ করবেন?
এলাকাবাসী দাবি জানাচ্ছেন দ্রুত তদন্তের, গুণগত মান নিশ্চিতের। কিন্তু তদন্ত হয়, রিপোর্ট হয়, তারপর সব চাপা পড়ে যায়। এই চক্রটাই বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে পরিচিত গল্প।
ঠিকাদার যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে কোথায় লবণাক্ত বালু ছাড়া কাজ হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার। না হলে বাঁশখালীর এই রাস্তা আজ হবে, কাল ভাঙবে, আবার বরাদ্দ হবে, আবার লবণাক্ত বালু আসবে।
আর দশ হাজার মানুষ পথের কষ্ট নিয়েই পড়ে থাকবেন।