সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পুকুর সংস্কারের আড়ালে মাটির লুণ্ঠন, থামাবে কে?

রবিউল হোসেন | প্রকাশিতঃ ১৯ মে ২০২৬ | ১২:০৯ অপরাহ্ন


রাত গভীর হলে চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট এলাকায় একটি অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসে। স্ক্যাভেটরের ঘড়ঘড়। মাটি কাটার শব্দ। ভারী ট্রাকের চাকার ঘূর্ণন। আশপাশের মানুষ জানেন এই শব্দ কীসের। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস অনেকের নেই। কারণ এই ব্যবসার পেছনে আছে প্রভাবশালী মানুষ, আছে সিন্ডিকেট, আছে রাজনৈতিক ছায়া।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় এখন মাটি কাটা যেন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দিনে প্রকাশ্যে, রাতে আরও সাহসে। আইন আছে, প্রশাসন আছে, সংসদ সদস্যের হুঁশিয়ারিও আছে। কিন্তু মাটিখেকোদের কিছুই থামাতে পারছে না।

অনুমতিই ঢাল, শর্তই ফাঁকা কথা

কৌশলটা সহজ কিন্তু মারাত্মক। উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পুকুর সংস্কারের অনুমতি নেওয়া হয়। এই অনুমতিটাই হয়ে যায় সব অনিয়মের ঢাল। তারপর শুরু হয় আসল খেলা। পুকুর সংস্কারের নামে ফসলি জমি কাটা হয়, মাটি তোলা হয় বাণিজ্যিকভাবে, ট্রাকে ট্রাকে পাচার হয়ে যায়।

অনুমতিপত্রে শর্ত থাকে। কিন্তু সেই শর্ত মানার কোনো বালাই নেই। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে। আর মাটিখেকো সিন্ডিকেট জানে, কোথায় টাকা দিলে চোখ বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজান রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ভূমি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কৌশলে অনুমতি নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনকে বারবার জানানো হয়েছে। কিন্তু কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

নয়টি ইউনিয়নে একই ছবি

পটিয়ার ধলঘাট, কেলিশহর, হাইদগাঁও, মুজাফরাবাদ, শোভনদণ্ডী, খরনা, বড়লিয়া, আশিয়া ও কাশিয়াইশ। একটি নয়, দুটি নয়, উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে একই দৃশ্য। প্রতিটি এলাকায় গড়ে উঠেছে আলাদা আলাদা মাটি কাটার সিন্ডিকেট। তাদের দাপটে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

ধলঘাট এলাকায় বীরকন্যা প্রীতিলতা সড়কের পাশে প্রভা স্টোরের পশ্চিমে একটি বড় পুকুর সংস্কারের নামে চলছে লাগামহীন মাটি বিক্রি। ভারী ট্রাক আসছে, মাটি বোঝাই হয়ে যাচ্ছে। এই ট্রাকের ভারে বেহাল হয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রীতিলতা সড়কটি। যে সড়ক দিয়ে হাজারো মানুষ চলাচল করেন, সেই সড়ক এখন খানাখন্দে ভরা।

কেলিশহর ইউনিয়নের রতনপুর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। ধানিজমির শ্রেণিই বদলে দেওয়া হয়েছে। যে জমিতে একসময় ধান হতো, সেখানে এখন পুকুর। মাটি কেটে নেওয়ার পর জমি আর কৃষিকাজের উপযুক্ত থাকছে না। আগামী প্রজন্ম হারাচ্ছে আবাদি জমি।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া মাটি উত্তোলন ও বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। কৃষিজমি বা পরিবেশের ক্ষতি করে মাটি বিক্রি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। পুকুর খননের নামে বাণিজ্যিকভাবে মাটি বিক্রিও নিষিদ্ধ।

আইনের বইয়ে সব লেখা আছে। কিন্তু মাঠে সেই আইন অদৃশ্য।

ধলঘাট ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. শাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, শর্ত ভঙ্গের সত্যতা পেয়ে রোববার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশের পরও দুই দিন ধরে দিনে-রাতে চলছে মাটি বিক্রি।

নির্দেশ যদি কাগজেই থাকে, বাস্তবে তার কোনো মূল্য নেই।

সংসদ সদস্যের হুঁশিয়ারি, মাঠে নির্লিপ্ততা

চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু সেই হুঁশিয়ারি বাতাসে মিলিয়ে গেছে। থামেনি মাটি কাটা।

বরং পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে গত ১১ মে বড়লিয়া ইউনিয়নে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। চারজনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। মাটির ব্যবসায় এখন শুধু অর্থনৈতিক লোভ নয়, রাজনৈতিক দলাদলিও মিশে গেছে।

বর্ষার আগে বিপদের শঙ্কা

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানের সতর্কবার্তা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। তিনি বলছেন, সামনে বর্ষা মৌসুমে পুকুরের পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে। যেভাবে মাটি কেটে পুকুর গভীর করা হচ্ছে, পাড় দুর্বল হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে সেই পাড় ধসে গেলে বড় দুর্ঘটনা হতে পারে।

পুকুরের পাশে বাড়ি যাঁদের, রাতে ঘুমের মধ্যে বিপদ আসতে পারে তাঁদের দরজায়। এই আশঙ্কা নিয়ে প্রতিটি রাত কাটাচ্ছেন পটিয়ার অনেক পরিবার।

প্রশাসনের মুখে আশ্বাস, বাস্তবে শূন্য

পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান বলছেন, শর্ত ভঙ্গের আলামত পেলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা, কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান আছে।

বিধান আছে। কিন্তু প্রয়োগ কোথায়? নয়টি ইউনিয়নে দিনে-রাতে মাটি কাটা চলছে, আর প্রশাসন বিধানের কথা বলছে। এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে আছে পটিয়ার ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা।

মাটি একবার চলে গেলে ফেরে না। ফসলি জমি একবার পুকুর হয়ে গেলে আর ফসল হয় না। এই ক্ষতি অপূরণীয়। কিন্তু সিন্ডিকেটের লোভ থামানো না গেলে, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা না কাটলে, পটিয়ার এই লুণ্ঠন চলতেই থাকবে।