
ভোরের আলো ফোটার আগেই ফটিকছড়ির পাহাড়ি ঢালে নামেন জেসমিন আক্তার। কুয়াশামাখা সকালে সবুজ চা বাগানের সারি সারি গাছের মাঝে তাঁর হাত চলে অবিরাম। দ্রুত, নিখুঁত, অভিজ্ঞ। প্রতিটি কচি দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি বাছাই করে ঝুড়িতে ফেলেন, যেন চোখ বন্ধ করেও পারেন।
এই হাত দুটি এখন সারাদেশে পরিচিত। ১৬৮টি চা বাগানের মধ্য থেকে পরপর তিনবার বেছে নেওয়া হয়েছে এই হাত দুটিকে। দেশের শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী শ্রমিক, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ইস্পাহানি গ্রুপের নেপচুন চা বাগানের জেসমিন আক্তার।
কুমিল্লার মেয়ে যেভাবে ফটিকছড়িতে
জেসমিনের গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক দূরে। কুমিল্লার এক সাধারণ ঘরের মেয়ে, মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন। স্বামী আবদুল বারেকের সঙ্গে ঘর বাঁধতে চলে এলেন ফটিকছড়ির নেপচুন চা বাগানে।
নতুন পরিবেশ, নতুন জীবন। পাহাড়ের কোলে চা বাগানের ঘরে সংসার শুরু হলো। তারপর স্বামীর সঙ্গে লেগে পড়লেন বাগানের কাজে। চা পাতা তোলা শিখলেন। সেই থেকে শুরু।
চল্লিশ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। বয়স এখন আটান্ন। কিন্তু হাতের দক্ষতায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বরং বছরের পর বছর ধরে শানিত হয়েছে সেই দক্ষতা। এই বয়সে এসে তিনি প্রতি ঘণ্টায় তুলতে পারেন প্রায় ৪৯ কেজি চা পাতা। গত এক বছরে তাঁর হাতে উঠে এসেছে ২৬ হাজার ২১৭ কেজি পাতা।
সোমবার ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসে অনুষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী নির্বাচন প্রতিযোগিতায় মাত্র ৩০ মিনিটে ১৩ কেজি পাতা তুলে আবারও শীর্ষে উঠলেন জেসমিন। তৃতীয়বারের মতো দেশসেরার মুকুট পরলেন এই অদম্য নারী।
সংসার আর বাগান, একই সুতোয় গাঁথা
জেসমিনের গর্বের জায়গা শুধু পুরস্কার নয়। তাঁর পরিবারের আটজন সদস্য এই একই বাগানে কাজ করেন। স্বামী, পুত্র, কন্যা, সবার জীবিকা জড়িয়ে আছে নেপচুন চা বাগানের সবুজ পাতার সঙ্গে।
নিজেই বলছিলেন, পরপর তিনবার দেশসেরা হতে পেরে সত্যি আনন্দিত। পুরো পরিবার একই বাগানে কাজ করে, এটাও তাঁর কাছে বড় গর্বের।
একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের ঘাম মিশে আছে এই বাগানের মাটিতে। তাঁদের পরিশ্রম, তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের জীবন ঘুরছে এই চা পাতার চারপাশে।
নেপচুনের গৌরব
ফটিকছড়ির পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে দুই হাজার সাতশো একর জুড়ে বিস্তৃত নেপচুন চা বাগান। ১৯৬০ সালে গড়ে ওঠা এই বাগান দীর্ঘ পঁয়ষট্টি বছরে অনেক পুরস্কার পেয়েছে। ২০০৯ সালে বৃক্ষরোপণে দেশসেরা, ২০২০ সালে গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড। ২০২৩ সালে এই বাগানের শ্রমিক উপলক্ষী ত্রিপুরা দেশসেরা হয়েছিলেন। তারপর থেকে টানা তিনবার জেসমিন।
বাগান ব্যবস্থাপক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলছেন গর্বের কথা। তাঁর ভাষায়, জেসমিনের এই স্বীকৃতিতে বাগান সংশ্লিষ্টরা তো বটেই, দেশও গর্বিত।
চায়ের দেশে একজন নীরব নায়িকা
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১৩টি দেশে চা রপ্তানি করছে। ২০২৫ সালে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২৯২ মিলিয়ন টাকা। চায়ের গুণগত মান, সুষ্ঠু উৎপাদন, সঠিক পাতা বাছাই এই রপ্তানির ভিত্তি। আর সেই ভিত্তির একটি মজবুত স্তম্ভ হলেন জেসমিনের মতো অভিজ্ঞ শ্রমিকেরা।
মিডিয়ার আলো তাঁদের দিকে কম পড়ে। নীরবে, নিভৃতে, পাহাড়ের কোলে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে যান এঁরা। চায়ের সুবাস যখন কোনো শহুরে কাপে ভেসে ওঠে, তখন কেউ ভাবেন না কার হাতের স্পর্শ মিশে আছে সেই পাতায়।
জেসমিন আক্তারের গল্পটা শুধু একটি পুরস্কারের গল্প নয়। এটি ৪২ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্প। ষোলো বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে পাহাড়ের কোলে জীবন শুরু করা এক নারীর অদম্য যাত্রার গল্প। যে গল্পে জয় আসে নিঃশব্দে, তবে গভীরভাবে।
ঢাকায় চা দিবসের মঞ্চে যখন তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে, তখন হয়তো সেই হাতের প্রতিটি রেখায় ফটিকছড়ির পাহাড়ি ভোরের গল্প লেখা থাকবে।