
চট্টগ্রামের আদালতপাড়া বৃহস্পতিবার সারাদিন ছিল অন্যরকম উত্তপ্ত। একদিকে ভোটগ্রহণ চলছে, অন্যদিকে রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল। স্লোগানের আওয়াজ, পুলিশের উপস্থিতি, আর আইনজীবীদের দুই শিবিরের মুখোমুখি অবস্থান। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনকে ঘিরে এভাবেই উত্তাল হয়ে উঠল আদালত এলাকা।
সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চললেও বাইরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরা ভোটগ্রহণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। একই স্লোগান দুই পক্ষের মুখে, ভোট চোর, ভোট চোর।
একদিকে ভোট, অন্যদিকে বর্জন
এবারের নির্বাচনে সহ-সভাপতিসহ মোট ৯টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি সমর্থিত একটি প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আগেই বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট মো. সেলিম উদ্দিন জানান, দুপুর ২টা পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় সাতশো ভোট পড়েছে। দুপুরের পর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কিন্তু যে নির্বাচনকে দুটি বড় পক্ষ একযোগে বর্জন করেছে, সেই নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা কম থাকাটাই স্বাভাবিক।
জামায়াতপন্থীদের অভিযোগ
দুপুর ১২টার দিকে আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেন জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা। চট্টগ্রাম ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুল আলম কড়া ভাষায় বললেন, এটি একতরফা কথিত নির্বাচন। বৈধ প্রার্থী তালিকায় থাকা তাঁদের ১২ জন প্রার্থীও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
তাঁর অভিযোগ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। একটি পক্ষের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই এই নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে। গত ৫ মে থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন চলছে বলেও জানান তিনি।
আওয়ামীপন্থীদের একই সুর
বিকেল তিনটার দিকে সাধারণ আইনজীবী পরিষদের ব্যানারে বিপুলসংখ্যক আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা মিছিল বের করেন। মহানগর, জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের বিভিন্ন ফ্লোর ঘুরে মিছিলটি আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ের সামনে শেষ হয়।
সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামীপন্থী আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ বললেন, নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন স্বৈরাচারী কায়দায় একতরফা নির্বাচন করছে। সভাপতি ও সেক্রেটারি আগেই বিনাভোটে নির্বাচিত। আর তাঁদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়েছে, ফরম বিক্রি করা হয়নি। তাই তাঁরাও নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছেন।
১৩৩ বছরের ঐতিহ্যে প্রশ্নচিহ্ন
সাধারণ আইনজীবীরা বলছেন সবচেয়ে উদ্বেগের কথাটি। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ১৩৩ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে কখনো ভোটবিহীন বা অটো কমিটি গঠনের নজির নেই। করোনার কঠিন সময়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে এই সমিতিতে।
কিন্তু গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও তারা একটি পাতানো ও একতরফা নির্বাচনের অভিযোগ তুলছেন। তাঁদের মতে, এই সাজানো নির্বাচনের কারণে দিন দিন সমিতির গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে দিনটি আরও অপ্রীতিকর হয়ে উঠল একটি ঘটনায়। নির্বাচন কভার করতে আসা চ্যানেল ওয়ানের ব্যুরো প্রধান ও ক্যামেরাপার্সনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ সংগ্রহের স্বাভাবিক কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হওয়ার এই অভিযোগ ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও উত্তেজনা পুরোপুরি এড়ানো যায়নি।
চট্টগ্রামের আইনজীবী সমাজ দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারিত্ব ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। সেই সমাজের নির্বাচনে এভাবে দুটি বড় পক্ষের একযোগে বর্জন, রাস্তায় মিছিল আর সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ, সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ১৩৩ বছরের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কি সত্যিই হুমকির মুখে পড়ছে?