সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পাহাড়ে শান্তির পথপ্রদর্শক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

জহিরুল ইসলাম | প্রকাশিতঃ ২২ মে ২০২৬ | ৯:০৫ পূর্বাহ্ন


১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যখন নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে সংবিধান রচনায় ব্যস্ত, তখন প্রথমেই শেখ মুজিব সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। পাহাড় ও সমতলসহ সারাদেশের মানুষ, জাতি-উপজাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীর ওপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই ব্যর্থতা প্রকাশ পায়। চাপিয়ে দেওয়া এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মেনে না নিয়ে সরাসরি বিদ্রোহ করে, যার ফলে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমাদের প্রকৃতির লীলাভূমি, অপরূপ সুন্দর তিন পার্বত্য এলাকা আজও অশান্ত।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের গণপরিষদে যখন সংবিধান রচিত হচ্ছিল, তখন জাতিগত পরিচয় হিসেবে বাঙালিত্ব গ্রহণের সময় বিতর্কে অংশগ্রহণ করে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেছিলেন, ‘আমি একজন চাকমা। একজন মারমা কখনো চাকমা হতে পারে না। একজন চাকমাও বাঙালি হতে পারে না। আমি একজন চাকমা। আমি বাঙালি নই। আমি বাংলাদেশের নাগরিক। একজন বাংলাদেশি। আপনিও একজন বাংলাদেশি, কিন্তু জাতিগত পরিচয়ে একজন বাঙালি। তারা (উপজাতীয়রা) কখনো বাঙালি হতে পারে না।’ এখানে উল্লেখ্য যে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭০ সালেও।

মানবেন্দ্র লারমার যুক্তি সঠিক হলেও তাঁর কথা শোনার ধৈর্য কারও ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান উপজাতীয়দের বাঙালি হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হন। ফলে সংবিধান অনুযায়ী সমগ্র জনসমষ্টি বাঙালি হয়ে গেল। বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্তত ৫৭টি উপজাতীয় জনগণ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভ্রান্তি ও সংশয় সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশে বসবাসকারী সকলেই যদি বাঙালি হয়, তাহলে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, মণিপুরীরা কী? ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীরাই বা কী? মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যা বলেছিলেন, তা কি ফেলে দেওয়ার মতো?

‘৭২-এর সংবিধানে সকলকে বাঙালি বলে সংজ্ঞায়িত করা হলে পরবর্তীতে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা বাঙালি বলে স্বীকার করাকে নিজেদের অস্তিত্ব বিনাশের কারণ হবে বলে মনে করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জন্ম নেয় ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে তৈরি হয় বিরোধ, যা একসময় সশস্ত্র রূপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুরো জাতি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত, তখন প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ধনে ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। জনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন ছিল এর সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী। এম এন লারমা শান্তিবাহিনী নামে এই সশস্ত্র শাখা গঠন করেন ১৯৭৩ সালে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আত্মগোপনে চলে যান এবং ১৯৭৬ সাল থেকে শান্তিবাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক অপতৎপরতা শুরু করে। পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম সংবিধানে উল্লেখিত বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সংশোধিত সংবিধানের ৬ নং ধারার (২) উপধারায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন’। এ সংশোধনের মধ্য দিয়ে বহু অবাঙালি ও উপজাতি বাংলাদেশেরই মানুষ বলে স্বীকৃতি পায়। সেই সাথে সারাদেশের মানুষ জাতি-উপজাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একক রাষ্ট্রীয় পরিচয় লাভ করে। এর মাধ্যমে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় চেতনার বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলো, স্বাধীনতার পরপর এম এন লারমার নেতৃত্বে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ধন, ষড়যন্ত্র, আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সহায়তায় গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও সশস্ত্র শান্তিবাহিনী ততদিনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। ফলে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতা অব্যাহত রাখে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে সেনাবাহিনী ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর তাদের সশস্ত্র হামলা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, দেশদ্রোহিতা দমন এবং শান্তিবাহিনীর ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস দমনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বত্র সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী মোতায়েন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এর সাথে সাথে প্রশাসনিক উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের লামা, কাপ্তাই ও খাগড়াছড়ি থানাকে মহকুমায় উন্নত করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে থানার সংখ্যা ১২টি থেকে বাড়িয়ে ২০টিতে উন্নীত করেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পাহাড়ের মানুষের উন্নয়নের জন্য সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি করেন এবং পাহাড়ের পতিত জমিতে লিজ প্রথা চালুর মাধ্যমে রাবার বাগান ও হর্টিকালচার সৃষ্টি করে উৎপাদনের আওতায় আনেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলায় প্রতিটি ২৫ একর করে ২০০০টি রাবার ও হর্টিকালচার বাগানের জন্য ভূমি লিজ দেওয়া হয়। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় আনার জন্য সমতলের ভূমিহীন, গৃহহীন ও ভাসমান ছিন্নমূল গরিবদের পাহাড়ে পুনর্বাসন করেন।

১৯৭৯-১৯৮১ সালে তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসনের প্রথম পর্যায়ে ৩০,৭৮০টি পরিবার, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৬,৪১৩টি পরিবার, তৃতীয় পর্যায়ে ৭,১০৬টি এবং সর্বশেষ চতুর্থ পর্যায়ে ১,২৮৫টি পরিবারসহ মোট ৫৫,৫১৭টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এতে ব্রিটিশ আমলের বর্ণবৈষম্য নীতি পরিহার করে উদারনীতি ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যান।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া চাকমা রানি বিনীতা রায়কে পার্বত্য উপদেষ্টা ও বান্দরবানের বোমাং সার্কেল চিফ অংশৈ প্রু চৌধুরীকে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করে ট্রাইবাল কনভেনশন গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যাকে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মাধ্যমে ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন শুরু করেন। তিনি তাঁর সময়ে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ায় বর্তমানে পাহাড়ের জনগণ এর সুফল ভোগ করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল এবং অনুকরণীয়। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সংবিধান পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক স্থানীয় সরকার পরিষদ (যা পরবর্তীতে পার্বত্য জেলা পরিষদ নামে পরিচিত) সৃষ্টি করে পাহাড়ে জাতিগত বৈষম্যের বিষবৃক্ষ রোপণ করেন, যার ধারাবাহিকতা এখনও চলমান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যতদিন অটুট থাকবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী ও দূরদর্শী ভূমিকার কথাও ততদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়ের একক জাতিগত ও সাংবিধানিক পরিচয় দিয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।