সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শেখ হাসিনা, দাবি আওয়ামী লীগ নেতাদের

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৩ মে ২০২৬ | ১০:১৫ পূর্বাহ্ন


মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শুক্রবার আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা দলীয় প্রধানের সঙ্গে সরাসরি ও ভার্চুয়ালি যোগাযোগের পর এই তথ্য জানিয়েছেন।

টাইমস অব বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার জন্য ইতিমধ্যে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত হতে বলা হয়েছে। নির্বাসনে থাকার বদলে সরাসরি আইনি লড়াইয়ের এই সিদ্ধান্তকে তার একটি বড় রাজনৈতিক চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে বাস্তবতার চেয়ে বরং ‘রাজনৈতিক চমক’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, দল যখন চরম চাপের মুখে, তখন নেতাকর্মীদের চাঙ্গা ও সতর্ক রাখতেই এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এরই মধ্যে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান। সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি যেভাবে ভারত গিয়েছিলেন, সেভাবেই বীরের বেশে দেশে ফিরবেন।

এই বক্তব্য শুধু নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার জন্য কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আপনারা অপেক্ষা করুন এবং দেখুন। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে একটি বড় জমায়েত আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এই দুঃসময়ে দলের অসহায় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতেই তিনি দেশে ফিরছেন।

সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বিচারের মুখোমুখি হতে ইচ্ছুক।

ওই নেতা আরও জানান, ভারত সরকারকেও তার এই ইচ্ছার কথা জানানো হয়েছে। আগামী ১৫ আগস্টের আগেই তিনি হয়তো নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করবেন।

সম্প্রতি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের বলেছেন, আমার এই বয়সে বড়জোর আর কয়েক বছর বাঁচব। দেশের গণতন্ত্রের জন্য যদি আমাকে ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়, তাতেও আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর দলের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে যান অথবা দেশ ছাড়েন।

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের ২৭ অক্টোবর এক নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করার আইনি বৈধতা পায় সরকার। ফলে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী এখন মামলা, গ্রেপ্তারের আতঙ্ক এবং চরম আর্থিক সংকটে দিন পার করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা নিয়মিত তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ভারত সরকার তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দিচ্ছে।

শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সারা দেশে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আইনি প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তির আওতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচার আমরা নিশ্চিত করতে চাই। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনামলে কথার জোরেই টিকে ছিলেন এবং এখনো কথার মাধ্যমেই কর্মীদের চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছেন। তার সত্যি দেশে ফেরার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আমি দেখি না।

দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, শেখ হাসিনা কবে আসবেন তা বড় বিষয় নয়, বরং তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব। আমরা আশা করি, সরকার তাকে দেশে এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের যুক্তি হলো, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থেই শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যেহেতু এখন একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, তাই আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া উচিত।

গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-১) শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।

ট্রাইব্যুনাল জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গণহত্যা, হত্যার নির্দেশ ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তার সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে প্রথমে তাকে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, খুন ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে।

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, আপিল করার সময় এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট তাকে আপিল করার অনুমতি দেবে কি না, তা আদালতের বিষয়।

তাজুল ইসলাম আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা বহাল থাকা অবস্থায় তার দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এটি স্রেফ শেখ হাসিনার একটি রাজনৈতিক চমক। তবে তিনি যদি সত্যিই দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান, তবে সেটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে।