
মাদ্রাসায় পড়ুয়া ৭ বছরের মেধাবী শিক্ষার্থী রাহেলা (ছদ্মনাম) ঘটনার দিন বিকালে প্রতিবেশীর বাসায় ইফতারি নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বেশ কিছু সময় পর তাকে রক্তাক্ত ও টালমাটাল অবস্থায় বাড়ির পথে ফিরতে দেখেন তার মা।
গুরুতর জখম অবস্থায় দ্রুত তাকে ভর্তি করা হয় নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। জ্ঞান ফিরলে প্রতিবেশী এক দোকানদার কর্তৃক বীভৎস যৌন নির্যাতন ও হামলার ঘটনা তুলে ধরে শিশুটি। এই ঘটনা গত বছরের ২২ মার্চ নোয়াখালী সোনাইমুড়ী উপজেলার নদনা এলাকার।
সেসময় বীভৎস যৌন নির্যাতন ও নৃশংসতার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা। বিচারের দাবিতে তখন শুরু হয় সড়ক অবরোধ ও আন্দোলন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত রেজাউল করিম বাদশাকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে স্থান পায়।
এরপর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ১৪ মাস। অথচ আজ সেই প্রধান অভিযুক্ত রেজাউল করিম বাদশা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর ভুক্তভোগী শিশুটির দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।
ভুক্তভোগী শিশু রাহেলা জানায়, মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় রাস্তায় অভিযুক্ত রেজাউল করিম বাদশাকে দেখলে সে এখন ভয়ে আঁতকে ওঠে।
ভুক্তভোগী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মাগুরার আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার কয়েকদিন পর তার ৭ বছরের বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে সেসময় সোনাইমুড়ীতে বিক্ষোভ হয়। বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন করে ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন অনেকে। তবে এরপর আর কেউ খোঁজ রাখেনি। আছিয়ার মতো তাদের কথাও সকলে ভুলে গেছেন।
শিশুটির মা জানান, বহুবিবাহ ও নির্যাতন করায় দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। দুই শিশুসন্তান নিয়ে কোনো রকমে মায়ের বাড়িতে দিন পার করছেন তিনি। গ্রামে হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে কোনো রকমে তাদের সংসার চলে। এর মধ্যে মামলা আর আদালতে প্রতি হাজিরায় আইনি খরচ তার জন্য অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মামলার শুরুতে দুটি তারিখে শুধু আইনজীবীকে দিতে হয়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। পরের তিন হাজিরায় অর্থাভাবে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। এরপরই অভিযুক্ত রেজাউল করিম বাদশার জামিন হয়ে যায়। আগামী ২৯ জুলাই পরবর্তী হাজিরার জন্য ৫ হাজার টাকা দাবি করেছেন আইনজীবী। এই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন তা তিনি জানেন না।
ডিএনএ টেস্টের দাবি জানিয়ে শিশুটির মা বলেন, তার মেয়ের বাম পায়ের রানের পেছনের অংশে ধারালো কিছু দিয়ে গভীর গর্ত করে সেখানে ধর্ষক রেজাউল করিম বাদশা তার বাসনা চরিতার্থ করেছে। মেয়ের পরিহিত সেই সময়ের পায়জামাতে রক্ত ও ধর্ষকের বীর্যের চিহ্ন রয়েছে। থানা পুলিশের কাছে সেই পায়জামাটি দেওয়া হয়েছিল। ওই আলামতের ল্যাব পরীক্ষা হলে সহজেই এই জঘন্য কাজের সঙ্গে যুক্তদের অপরাধ প্রমাণিত হবে।
গত বছরের ২৭ মে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ডা. তাহমিনা আক্তারের সই করা প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীর শরীরে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের দেওয়া ফরেনসিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সেসময়ে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা, প্যাথলজিক্যাল, সনোগ্রাফিক্যাল এবং রেডিওলজিক্যালসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। ভুক্তভোগীর শরীরে সাম্প্রতিক সময়ে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের (ধর্ষণ) স্পষ্ট লক্ষণ ও আলামত পাওয়া যায়।
চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভুক্তভোগীর শরীরে একাধিক স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। ভুক্তভোগীর শরীরের স্পর্শকাতর অংশে (পেরিনিয়াম এলাকায়) ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কারণে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ একটি গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার অংশ ছিলে গেছে। এছাড়া, শারীরিক নির্যাতনের কারণে ভুক্তভোগীর পেটের বাম পাশে প্রায় ১১ × ৫ সেন্টিমিটার আয়তনের একটি বড় কালশিটে বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। এর আগে প্রাথমিক ইনজুরি রিপোর্টেও ভুক্তভোগীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই বিষয়ে আইনজীবী কল্পনা রানী দাস জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি দায়ের হয়। শুরুতে তিনি এই মামলার দায়িত্বে ছিলেন এবং ভুক্তভোগী শিশুকে হাসপাতালে দেখতেও গিয়েছিলেন। দুটি হাজিরায় তিনি অংশ নিয়েছিলেন। পরে শিশুটির মা ওই মামলাটি তাদের পরিচিত অন্য একজন আইনজীবীর কাছে হস্তান্তর করেন।
নোয়াখালী নারী অধিকার জোটের আহ্বায়ক রৌশন আক্তার লাকি জানান, ঘটনা জানতে পেরে নোয়াখালী নারী অধিকার জোটের পক্ষ থেকে তারা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তখন সামান্য কিছু সহযোগিতাও করা হয়েছিল। পরে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য পরিবারটির দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তা রিসিভ হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবার চাইলে নোয়াখালী নারী অধিকার জোট আবারও তাদের সহযোগিতা করবে বলে রৌশন আক্তার লাকি আশ্বাস দেন।