
সাইপ্রাসের পারেক্লিশিয়া এলাকায় একটি দ্বিতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি বাড়ি। কিন্তু এই বাড়িটি এখন কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্তে। গত ১৯ মে নিকোশিয়া ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এই ভবনসহ ওই সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন। মালিক: বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম—এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ, সেই অভিযোগের তদন্তে এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার পথে প্রথম সাফল্য
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ‘পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রক্রিয়া’র মাধ্যমে সাইপ্রাসের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠিয়েছিল। ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে চলা ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পদ জব্দ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
সাইপ্রাসের অর্থ পাচারবিরোধী ইউনিট ‘মোকাস’ সেই অনুরোধের ভিত্তিতে আদালতে আবেদন করে। এবং ১৯ মে আদালত সম্পদ জব্দের আদেশ দেন।
এটি কেবল একটি বাড়ি জব্দের ঘটনা নয়। এটি একটি সংকেত—যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ এখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আসতে শুরু করেছে।
কে এই সাইফুল আলম?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম, যিনি এস আলম মাসুদ নামে বেশি পরিচিত, তিনি এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে ব্যাংকিং, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে তার বিশাল সাম্রাজ্য একসময় ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী।
২০১৬ সালে তিনি সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করেন। এই কর্মসূচিটি বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তীতে বিতর্কের মুখে সাইপ্রাস সরকার এই কর্মসূচি বাতিল করে দেয়। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নাম সরাসরি আসেনি।
১৩৪টি বাসের গল্প: যে বাস কখনো কেনা হয়নি
সম্পদ জব্দের আদেশের মাত্র এক দিন পর বাংলাদেশের একটি আদালত সাইফুল আলম এবং তাঁর দশজন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। এই মামলাটির সাথে জড়িত ছিল প্রায় ৬০ লাখ ইউরো সমমূল্যের একটি ঋণ।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এস আলম গ্রুপের এক সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে এই অর্থ ঋণ দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ১৩৪টি বাস কেনা। কিন্তু বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই বাসগুলো বাস্তবে কখনো কেনাই হয়নি।
এই একটি ঘটনাই বলে দেয়, অভিযোগের মাত্রা কতটা গভীর।
২০০৯ থেকে ২০২৪: পনেরো বছরের তদন্তের পরিধি
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সাইপ্রাসের কাছে পাঠানো নথিতে জানিয়েছে, তদন্তের পরিধি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে বিভিন্ন কোম্পানির একটি জটিল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ।
জালিয়াতি করে ঋণ নেওয়া, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচার—এই তিনটি অভিযোগ তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে বলেছেন, এই মামলায় ৮০০ কোটি ইউরোরও বেশি অর্থ দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেবল ইসলামী ব্যাংক নয়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণের বিষয়েও তদন্ত চলছে। সেসব ঋণের অনেকগুলো পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে যায়।
সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, জার্সি: বহুস্তরীয় জাল
আদালতের নথি থেকে উঠে এসেছে একটি জটিল আন্তর্জাতিক কাঠামোর চিত্র। সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং জার্সিতে ছড়িয়ে থাকা একাধিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ রয়েছে সেখানে।
সাইপ্রাসে নিবন্ধিত এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালও তদন্তের আওতায় এসেছে। ২০১৬ সালে এক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড কিনে নেওয়ার পর সাইফুল আলম এই কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করেছিলেন। তদন্তাধীন অর্থের লেনদেনে এই কোম্পানি ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ মনে করছে, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলো সাইপ্রাস ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে পারে।
এস আলমের পাল্টা অবস্থান
অভিযোগের বিপরীতে সাইফুল আলম নিজেও থামেননি। আইনি প্রতিষ্ঠান কুয়িন এমানুয়েলের আইনজীবীদের মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সব বিনিয়োগ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে এসেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো অন্যায্য।
তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিকারী কেন্দ্র আইসিএসআইডিতেও আবেদন করেছেন। সেখানে তাঁর দাবি, সম্পদের উপর নেওয়া পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি লঙ্ঘন করছে।
এই আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
যে প্রশ্নগুলো এখনও উত্তরহীন
সাইপ্রাসে একটি বাড়ি জব্দ হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে ৮০০ কোটি ইউরোর বাকি সম্পদ কোথায়? সিঙ্গাপুরে কতটুকু আছে? ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ট্রাস্টগুলোতে কী লুকিয়ে আছে?
তদন্তকারীরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন। দেশে দেশে আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে সেই জালের বিস্তার।
পারেক্লিশিয়ার দ্বিতল বাড়িটি এই দীর্ঘ গল্পের কেবল একটি অধ্যায়। বাকি অধ্যায়গুলো লেখা হচ্ছে আদালতের বিচারকক্ষে, তদন্তকারীদের ফাইলে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোয়।