
বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের লস্কর মৌলভীপাড়া। চারপাশে বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ, নীরব প্রকৃতি, সাদামাটা গ্রামীণ জীবন। এই পাড়ার মানুষ ভোরে ওঠেন মাঠের কাজে, বিকেলে ফেরেন ঘরে। খুব একটা আলাদা কিছু নেই এখানে।
কিন্তু হঠাৎ কী হলো?
রাস্তার দুই ধারে উড়ছে শত শত আকাশি-সাদা পতাকা। সাথে লাল-সবুজ। প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে সারিবদ্ধ ১৫০টি পতাকা বাতাসে দুলছে একসাথে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এটি বাংলাদেশের কোনো গ্রাম নয়—এ যেন দক্ষিণ আমেরিকার কোনো শহরতলি।
লস্কর মৌলভীপাড়া এখন সবার কাছে পরিচিত এক নতুন নামে: আর্জেন্টিনা পাড়া।
যেভাবে জন্ম নিল স্বপ্নের পাড়া
আগামী ১১ জুন শুরু হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষায় আছেন সেই মহাউৎসবের। কিন্তু বাঁশখালীর এই তরুণরা অপেক্ষায় বসে থাকেননি। তারা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছেন উৎসব।
আর্জেন্টিনা সমর্থক মো. এনামুল হক জানান, বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতেই এই উদ্যোগ। আর্জেন্টিনা ও বাংলাদেশের মোট ১৫০টি পতাকা, ব্যানার ও খুঁটিসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। পকেট থেকে টাকা দিয়েছেন নিজেরা। কেউ বেশি, কেউ কম।
কিন্তু আনন্দের হিসাব টাকায় মাপা যায় না।

পতাকার মৃদু দোলায় ফুটবলের গান
শনিবার সন্ধ্যায় পুরো পাড়া ছিল উৎসবের রঙে রঙিন। কেউ গায়ে জড়িয়েছেন আকাশি-সাদা জার্সি। কেউ হাতে নিয়েছেন পতাকা। ছোটরা ছুটছে এ মাথা থেকে ও মাথায়। বড়রা দাঁড়িয়ে দেখছেন, মুখে হাসি।
র্যালি হয়েছে, স্লোগান উঠেছে, মিলনমেলা বসেছে।
আর্জেন্টিনা সমর্থক গোষ্ঠীর সদস্য নাজিম উদ্দীন, সোহেল, আনিছ ও কামরুল বলেন, “ফুটবল আমাদের কাছে শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, ভালোবাসা ও একতার প্রতীক। সেই অনুভূতি থেকেই আমরা এই আয়োজন করেছি।”
তাঁর চোখে যে আলো ছিল, সেটি কোনো মাঠের আলো নয়—সেটি স্বপ্নের আলো।
লবণ মাঠের দেশে মেসির জার্সি
একটু ভাবলে অবাক লাগে। যে মাটিতে জীবন কাটে লবণ চাষে, যে মানুষের দিন কাটে উপকূলের রোদে-বৃষ্টিতে, তারাই মেসির দলের জন্য রাস্তা সাজাচ্ছেন পতাকায়। বুয়েনস আইরেস থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের এই গ্রামে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রং কীভাবে এত গভীরভাবে গেঁথে গেল?
সম্ভবত উত্তরটি সহজ। ফুটবল কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না। এটি মানুষকে জুড়ে দেয় আবেগের সুতোয়। আর্জেন্টিনা জিতলে বাঁশখালীর এই তরুণরাও জেতে। মেসি গোল করলে এই মাঠেও উল্লাস ওঠে।
এনামুল হক বলেন, “ভবিষ্যতেও খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে এমন ইতিবাচক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চাই।”
একটি পাড়া, দুটি দেশের পতাকা
লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয়: এই তরুণরা শুধু আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাননি। প্রতিটি আর্জেন্টিনার পতাকার পাশেই আছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ। দুটি দেশ, দুটি পতাকা, একই দড়িতে বাঁধা।
এই ছোট্ট বিষয়টিই বলে দেয়, এখানে দেশপ্রেমের কোনো ঘাটতি নেই। আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসা মানে বাংলাদেশকে ভুলে যাওয়া নয়। দুটো আবেগ একসাথে থাকতে পারে—এটাই প্রমাণ করেছে লস্কর মৌলভীপাড়ার তরুণরা।
বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশে একটি অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে। ঘরে ঘরে বিদেশি দলের পতাকা ওঠে, রাস্তায় রাস্তায় হয় র্যালি। দেশটি নিজে খেলে না, কিন্তু গোটা দেশ ফুটবলে মেতে ওঠে। এটি একটি দেশের ফুটবলপ্রেমের এক বিচিত্র, সুন্দর প্রকাশ।
বাঁশখালীর লস্কর মৌলভীপাড়া এই প্রকাশের একটি ছোট্ট কিন্তু উজ্জ্বল উদাহরণ।
১১ জুন বিশ্বকাপ শুরু হবে। আর্জেন্টিনা মাঠে নামবে। লস্কর মৌলভীপাড়ার আকাশি-সাদা পতাকাগুলো তখন আরও জোরে দুলবে বাতাসে।