সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

চকরিয়ায় এসআইকে বলির পাঁঠা বানিয়ে আড়ালে ওসি মনির

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩১ মে ২০২৬ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন


কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রেমিক যুগলকে উদ্ধারের নামে পুলিশের বর্বরোচিত লাঠিপেটার ঘটনায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হলেও মূল নির্দেশদাতা চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে ওসি মনিরের নির্দেশের কথা স্বীকার করলেও, ওসির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকায় নুরু মাঝির ছেলে নুরুল আমিন ও তার প্রেমিকাকে প্রকাশ্যে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওসি মনিরের চরম গাফিলতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণেই এমন অমানবিক ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয়রা জানান, ঈদগাঁও উপজেলার ওই তরুণী নুরুল আমিনের সাথে প্রেমের সম্পর্কের জেরে পালিয়ে আসেন। নুরুল আমিনের মায়ের ভাষ্যমতে, মেয়ের মা ও বাবা তাদের বাড়িতে আসার পর উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু মেয়েপক্ষের কয়েকজনের আপত্তিতে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।

তরুণীকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের প্রথম দলটি ব্যর্থ হয়। এরপর ওসি মনিরের সরাসরি নির্দেশে এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ সেখানে পৌঁছায়। তরুণীটি পুলিশের সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানালে এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলাম তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালান।

প্রেমিকাকে বাঁচাতে গিয়ে নুরুল আমিন নিজেও বেধড়ক পিটুনির শিকার হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় নুরুল আমিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এই ঘটনার পর জনরোষের মুখে এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। তবে মূল নির্দেশদাতা ওসি মনিরকে এখনো জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। অভিযুক্ত এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলাম নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ওসি মনিরের নির্দেশনায় এই অভিযানে গিয়েছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে ওসি মনির কোনোভাবেই এমন অমানবিক, অপেশাদার ও বেআইনি নির্দেশের দায় এড়াতে পারেন না। তার ভুল ও আগ্রাসী সিদ্ধান্তের কারণেই এলাকায় নুরুল আমিনের মৃত্যুর গুজব ছড়ায় এবং উত্তেজিত এলাকাবাসী পুলিশের ব্যবহৃত অটোরিকশা ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওসি মনিরকে পরে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হয়।

চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অভিজিৎ দাশ জানিয়েছেন, ভিকটিম উদ্ধারের এই অভিযানে পুলিশের কোনো সদস্যের গাফিলতি বা দোষত্রুটি প্রমাণিত হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অবিলম্বে ওসি মনিরকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

এদিকে চট্টগ্রাম প্রতিদিন সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার পুলিশের লাঠিপেটার সেই ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, একটি মেয়ে পালিয়েছিল ভালোবাসার মানুষের কাছে। দুই পরিবার বসেছিল, দেনমোহর ঠিক হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজনের মনমতো না হওয়ায় তারা থানায় গেল, আর থানা পাঠালো লাঠি।

হোসাইন তৌফিক ইফতিখার আরও লেখেন, ২০ বছরের মেয়েটি পুলিশের সঙ্গে যেতে চায়নি। কিন্তু ওসির পাঠানো এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামের নির্দয় লাঠি সেটা মানেনি। মেয়েটিকে পশুর মতো পেটানো হলো। প্রেমিক নুরুল আমিন এখন চট্টগ্রাম মেডিকেলে। চকরিয়ার সেই ঘরের দেয়ালে এখনও লেগে আছে দুটো মানুষের আর্তনাদ।

পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে হোসাইন তৌফিক ইফতিখার তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ৫ বছর পর যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে, ‘পুলিশ সংস্কার কেন দরকার ছিল?’ তখন কমেন্টে থাকা ভিডিওটাই হবে উত্তর।