সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মাদকের অন্ধকারে ডুবছে একটি প্রজন্ম: রাষ্ট্র কি দেখছে?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ৩১ মে ২০২৬ | ৮:৩১ অপরাহ্ন


রামিসা। নামটি এখন শুধু একটি নাম নয়, এটি একটি প্রশ্ন। একটি স্কুলছাত্রীর মৃত্যু, একটি পরিবারের বুকফাটা কান্না। কিন্তু সেই কান্নার পেছনে যে অন্ধকার, সেই অন্ধকারের নাম মাদক।

প্রতিদিন সকালের পত্রিকা খুললে একটি ভয়ংকর বাস্তবতা চোখের সামনে ভাসে। কোথাও ছিনতাই, কোথাও কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, কোথাও নৃশংস হত্যাকাণ্ড, কোথাও ধর্ষণ। এই অপরাধগুলোর সুতো ধরে পেছনে গেলে প্রায় সবক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন চালিকাশক্তি পাওয়া যায়- মাদক।

মাদকাসক্ত মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারায়। সে আর মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে একটি বিপদ। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য। আর এই বিপদ এখন আর কেবল শহরের অলিগলিতে সীমাবদ্ধ নেই- ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের মাঠে, স্কুলের করিডোরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।

রাজনৈতিক আশ্রয়ের কালো ছায়া

প্রশ্ন উঠতে পারে, এই মাদকের জোয়ার রুখে দেওয়া কি এত কঠিন? প্রযুক্তি আছে, আইন আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। তাহলে কেন এই ব্যর্থতা?

উত্তরটি সহজ, কিন্তু বেদনাদায়ক। মাদক কারবারিরা একা নয়। তাদের পেছনে আছে গডফাদার। সেই গডফাদাররা রাজনীতির আঁচল ধরে বসে আছেন। অনেক সময় তারা নিজেরাই রাজনীতির ভেতরে থাকেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন মাদক সিন্ডিকেটের অকাট্য তথ্য পায়, তখনও ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। উলটো অনুসন্ধান ধামাচাপা দেওয়া হয়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মাদক সমস্যাকে করে তুলেছে আরও গভীর। যখন একজন মাদক কারবারি দেখে যে ধরা পড়লেও রাজনৈতিক প্রভাব দিয়ে বেরিয়ে আসা যায়, তখন সে আরও সাহসী হয়। আর যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য নিজেই এই কারবারে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তখন পুরো ব্যবস্থাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

নতুন মাদক, নতুন বিপদ

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে নতুন ধরনের মাদকের কারণে। ইয়াবা ও আইসের পাশাপাশি এখন দেশে ঢুকছে কোকেন, এলএসডি, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ংকর ‘জম্বি’ মাদক।

এই ‘জম্বি’ মাদকের নামটি নিছক রূপক নয়। এই মাদক সেবনকারী মানুষ সত্যিকার অর্থেই জম্বিতে পরিণত হয়। বোধশক্তি লোপ পায়, মানবিকতা থাকে না, শুধু থাকে পশুর মতো প্রবৃত্তি।

আর এই মাদক এখন বিক্রি হচ্ছে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে। অর্ডার করলে বাড়িতে পৌঁছে যায়। পিৎজার চেয়েও সহজ। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার মাদক নিয়ন্ত্রণকে করে তুলেছে আরও কঠিন।

সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে সিন্ডিকেট

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সাময়িক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েছে মাদক সিন্ডিকেট। যখনই রাষ্ট্রের নজরদারি একটু শিথিল হয়, মাদকের বিস্তার হু হু করে বেড়ে যায়।

এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়গুলোতে মাদক সিন্ডিকেট সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। কারণ তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অন্য বিষয়ে ব্যস্ত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্য চিন্তায় মগ্ন।

এই সুযোগে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, কলেজের হোস্টেল, এমনকি স্কুলের আশপাশেও মাদকের সহজলভ্যতা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জিরো টলারেন্স: কথা ও কাজের ফারাক

বিগত বছরগুলোতে একাধিক সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে। কিন্তু ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল।

কারণ, জিরো টলারেন্স মানে শুধু অভিযান নয়। জিরো টলারেন্স মানে হলো- যে রাজনৈতিক নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় মাদক কারবারি বাড়ছে, তাকেও আইনের আওতায় আনা। যে পুলিশ কর্মকর্তা মাদক কারবারিকে আশ্রয় দিচ্ছেন, তাকেও শাস্তি দেওয়া। কিন্তু সেই সাহস কোনো সরকারই পুরোপুরি দেখাতে পারেনি।

ফলে অভিযান হয়েছে, ছোট কারবারিরা ধরা পড়েছে, জেলে গেছে। কিন্তু শিকড় কাটা যায়নি। গডফাদাররা থেকে গেছেন নিরাপদে।

যে পথে হাঁটতে হবে

এই সমস্যার সমাধান রুটিন অভিযানে নেই। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

প্রথমত, মাদক কারবারিদের পেছনে থাকা গডফাদারদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ছায়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে, ক্ষমতার কাছের মানুষ হলেও তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এই সাহস না দেখালে কোনো অভিযানই কাজে আসবে না।

দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে যারা মাদক সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না।

তৃতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। যে পথে মাদক আসছে, সেই পথ বন্ধ করতে না পারলে ভেতরে লড়াই করে লাভ নেই।

চতুর্থত, সামাজিক সচেতনতা এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় সমস্যার সমাধান হয় না। যে তরুণ মাদকের ফাঁদে পড়েছে, তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রজন্মের প্রশ্ন

মাদকের বিস্তার কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি একটি সভ্যতার প্রশ্ন। একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কীভাবে দেখছে, তার পরীক্ষা।

রামিসার মৃত্যু আমাদের সামনে সেই প্রশ্ন রেখে গেছে। এই মৃত্যু কি শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে? নাকি এই মৃত্যু থেকে আমরা শিক্ষা নেব?

রাষ্ট্র যদি এখনও না জাগে, যদি কথার ফুলঝুরির বদলে কাজ না হয়, যদি গডফাদারদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না হয়- তাহলে রামিসার মতো আরও অনেকে হারিয়ে যাবে অন্ধকারে।

একটি প্রজন্ম ডুবছে। রাষ্ট্র কি সত্যিই দেখছে?

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।