সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

এল নিনো আসছে, চট্টগ্রামের প্রস্তুতি কতটুকু?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩ জুন ২০২৬ | ৩:১৬ অপরাহ্ন


জুনের শুরু। এই সময়ে চট্টগ্রামে সাধারণত আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। পাহাড় থেকে নেমে আসে জলধারা, কর্ণফুলীর বুক ভরে ওঠে, কৃষকের মুখে ফোটে স্বস্তির হাসি।

কিন্তু এবার ছবিটা অন্যরকম।

রোদ ঝাঁজালো, বাতাস গরম, আকাশে মেঘের চিহ্ন নেই। দেশের চল্লিশটি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি কম হতে পারে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁতে পারে।

আর তার মধ্যেই নতুন সতর্কবার্তা এলো বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা থেকে। এল নিনো সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা এখন আশি শতাংশ। নভেম্বরের আগে সেই আশঙ্কা পৌঁছাতে পারে নব্বই শতাংশে।

চট্টগ্রামের জন্য এই সংকেত কেবল আবহাওয়ার খবর নয়। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, জীবিকা—সবকিছুর ওপর আসন্ন চাপের পূর্বাভাস।

এল নিনো কী এবং চট্টগ্রামের কী হতে পারে

এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতার সাথে সম্পর্কিত একটি জলবায়ুগত ঘটনা। এটি পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় হলে বাংলাদেশের বর্ষা বিলম্বিত হতে পারে এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে।

চট্টগ্রামের জন্য এর মানে হলো—যে বৃষ্টির অপেক্ষায় পাহাড়ি কৃষক আছেন, যে বর্ষার অপেক্ষায় হালদার মাছ ডিম দেবে, যে জলের প্রতীক্ষায় শুকিয়ে যাওয়া কূপ ভরবে—সেই বৃষ্টি আসতে পারে দেরিতে, আসতে পারে কম।

চট্টগ্রামের কৃষিতে আগুনের হুমকি

চট্টগ্রামের কৃষি পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর। মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী—এই উপজেলাগুলোর কৃষিজমি বর্ষার জলের জন্য অপেক্ষায় থাকে প্রতি বছর।

আমন ধান রোপণের সময় জুলাই-আগস্ট। কিন্তু বর্ষা বিলম্বিত হলে চারা রোপণ পিছিয়ে যাবে। দীর্ঘ খরায় জমি শুকিয়ে ফেটে যাবে। কৃষককে সেচের ওপর নির্ভর করতে হবে, বাড়বে উৎপাদন খরচ।

ইতোমধ্যে তাপপ্রবাহের কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় আম ও লিচুর বাগানে ফল ঝরে পড়েছে। ফলচাষিরা আশঙ্কা করছেন বড় ক্ষতির।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ি কৃষি পুরোপুরি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। সেচ ব্যবস্থা সেখানে দুর্বল। বৃষ্টি কম হলে জুম চাষ ও পাহাড়ি সবজি উৎপাদনে ধস নামবে।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, শীতকাল ছোট হয়ে আসছে, প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন না করতে পারলে কৃষি খাত বড় সংকটে পড়বে।”

উপকূলে নতুন বিপদ: লবণাক্ততা

চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল—বাঁশখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, সন্দ্বীপ—এই এলাকাগুলোর সামনে বাড়তি এক বিপদ অপেক্ষা করছে।

বৃষ্টি কম হলে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে। তখন সমুদ্রের লোনাপানি ঢুকে পড়ে নদী ও খালে। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ে। ধান চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের চাষ ব্যাহত হয়। পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে সন্দ্বীপ, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর উপকূলীয় কৃষিতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

হালদার কান্না

চট্টগ্রামের প্রকৃতির সবচেয়ে অনন্য সম্পদ হালদা নদী—বিশ্বের একমাত্র জোয়ারভাটার নদী যেখানে রুই জাতীয় মাছ প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়ে।

হালদার মাছের ডিম ছাড়ার মৌসুম বর্ষার শুরুতে। বজ্রপাতসহ তুমুল বৃষ্টি, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঠান্ডা জলের স্রোত—এই প্রাকৃতিক সংকেতেই মাছ ডিম দেয়।

বর্ষা বিলম্বিত হলে বা কম হলে হালদার এই প্রজনন চক্র বিঘ্নিত হয়। ইতোমধ্যে গত কয়েক বছরে হালদার ডিম সংগ্রহ কমে যাচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীতে তাপের যন্ত্রণা

চট্টগ্রাম নগরীতে গত দুই দশকে গাছ কমেছে, পাকা সড়ক ও ভবন বেড়েছে। পাহাড় কাটা হয়েছে, জলাধার ভরাট হয়েছে। এই পরিবর্তন নগরীকে করে তুলেছে তাপের ফাঁদ।

বাইরে গরম বাতাস, বাড়িতে এসি চলছে—এই এসি থেকে বের হওয়া তাপ আরও গরম করছে বাইরের বাতাস। এই চক্র চলতে থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেছেন, “গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। আগে কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বাড়ত, এখন দীর্ঘ সময় ধরে তাপদাহ থাকছে। রাতের তাপমাত্রাও কমছে না।”

রাতের তাপমাত্রা না কমা মানে শরীর বিশ্রাম পাচ্ছে না। দিনের গরম রাতেও শরীর বহন করছে। এটি হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।

২০২৪ সালে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে টানা ছত্রিশ দিন তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। হাসপাতালে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার রোগী বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার কুলি, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক ও দিনমজুর—যারা রোদে কাজ না করলে সংসার চলে না।

প্রস্তুতির অভাব সবচেয়ে বড় বিপদ

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, শৈত্যপ্রবাহ—এগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কিছু প্রস্তুতি আছে। কিন্তু তাপপ্রবাহের বিরুদ্ধে প্রায় কিছুই নেই।

তাপপ্রবাহ এখনো সরকারিভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেই, আলাদা বাজেট নেই, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা কাঠামো নেই।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, “বিশ্বের অনেক দেশ তাপপ্রবাহকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাপপ্রবাহ চলাকালে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়।”

চট্টগ্রাম নগরে এই ধরনের কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই।

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেছেন, “নগরাঞ্চলে গাছপালা ও জলাধার বাড়ানো ছাড়া তাপমাত্রা কমানোর কার্যকর বিকল্প নেই।”

চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে, জলাধার ভরাট অব্যাহত থাকলে, নগরে সবুজ না বাড়লে—তাপের বিরুদ্ধে এই নগরীর প্রতিরোধ শক্তি ক্রমেই কমতে থাকবে।

পরিবেশমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে দেশে পঁচিশ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বাগান সম্প্রসারণ করা হবে।

পরিকল্পনাটি ইতিবাচক। কিন্তু গাছ লাগানো আর গাছ বাঁচানো—দুটো আলাদা কাজ। চট্টগ্রামে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হয়, কিন্তু লাগানো গাছের কতটুকু বাঁচে তার হিসাব অস্পষ্ট।

প্রস্তুতির সময় এখনই

এল নিনো এলে চট্টগ্রামের কী হতে পারে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু ঝুঁকিটা স্পষ্ট।

বর্ষা দেরিতে আসলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়বে। হালদার প্রজনন বিঘ্নিত হবে। নগরীতে তাপ বাড়বে। শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এল নিনোকে বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য জরুরি সতর্কবার্তা বলে উল্লেখ করেছেন।

চট্টগ্রামের জন্য এই সতর্কবার্তা মনোযোগ দিয়ে পড়ার সময় এখনই। কারণ প্রকৃতি সতর্ক করে দেয়। প্রশ্ন হলো, আমরা শুনি কিনা।