সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বন খাচ্ছে ক্ষুধা, বাজার আর উন্নয়ন

বাংলাদেশে বন উজাড়ের নতুন মুখ: কাঠচোর নয়, কৃষি অর্থনীতি
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ জুন ২০২৬ | ২:৫৮ অপরাহ্ন


চট্টগ্রামের আনোয়ারার কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) এলাকায় দাঁড়ালে বাংলাদেশের বন ও উন্নয়নের দ্বন্দ্বকে এক ফ্রেমে দেখা যায়।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই প্রকল্পকে ঘিরে চলছে বিতর্ক। একদিকে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, বিদেশি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে পাহাড় কাটা, বনভূমির পরিবর্তন এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন। পরিবেশ অধিদপ্তর একসময় পাহাড় কাটার অভিযোগে কেইপিজেডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। পরে বিষয়টি আদালত ও প্রশাসনিক পর্যায়ে দীর্ঘ বিতর্কের জন্ম দেয়।

কেইপিজেডের গল্প আসলে বাংলাদেশের বৃহত্তর এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

দেশের বনভূমি এখন শুধু কাঠচোরের করাতের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে না। হারিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, নতুন বসতি এবং বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার চাপে।

একদিকে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণে সংরক্ষিত বনভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে, হাতির চলাচলের করিডর সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে খাগড়াছড়ির পিটাছড়া, মাটিরাঙ্গা, গোমতী কিংবা পানছড়ির পাহাড়ে আগুন দিয়ে বন পরিষ্কার করে কচুর মুখি, কাসাভা, পাম ও ফলের বাগান তৈরি হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বনভূমির সবচেয়ে বড় শত্রু কি এখন আর কাঠচোর নয়?

বরং কৃষি, উন্নয়ন ও অর্থনীতির বর্তমান কাঠামোই কি বন হারানোর প্রধান চালক হয়ে উঠছে?

বন হারানোর তিন মুখ

একদিকে কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইন। আরেকদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে কচুর মুখি, কাসাভা, পামগাছ, আনারস, মাল্টা চাষ। আর পেছনে আছে দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও জমির চাহিদা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান মনে করেন, বন ধ্বংসের সব দায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপিয়ে দিলে পুরো চিত্রটি দেখা যায় না।

তিনি বলেন, “দেশে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাদের জন্য কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিল্পায়নের জন্য নতুন জমির প্রয়োজন হয়েছে। ফলে অনেক বনভূমি উজাড় হয়েছে। শুধু গাছ লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না, বনভূমির আয়তন বাড়ানোর বিষয়ে রাষ্ট্রকে আলাদা করে ভাবতে হবে।”

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ কতটা বন হারিয়েছে?

হারিয়ে যাচ্ছে এক বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বাস্তবে আছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ।

বন অধিদপ্তর কাগজে-কলমে ১৭ শতাংশ বললেও অনেক গবেষক সেটিকেও অতিমূল্যায়িত বলে মনে করেন।

গত এক দশকে দেশে এক লাখ হেক্টরের বেশি বনভূমি কমেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর হারিয়েছে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম। অর্থাৎ দেশের বন উজাড়ের কেন্দ্রবিন্দু এখন পাহাড়।

যেখানে হাতির পথ, সেখানে ট্রেন

কক্সবাজার রেললাইন দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু এর জন্য তিনটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছে প্রায় ১১৯ একর বনভূমি।

কাটা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার গাছ। বাধাগ্রস্ত হয়েছে হাতির ১৬টি চলাচল পথ।

অবাক করার বিষয়, প্রকল্প চালু হয়েছে, ট্রেন চলছে, কিন্তু বন বিভাগের সাড়ে ৯ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আজও ঝুলে আছে প্রশাসনিক জটিলতায়।

এখানে শুধু বন হারানোর গল্প নেই। আছে পরিবেশগত ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নিয়েও রাষ্ট্রের অস্পষ্টতার গল্প।

পাহাড় পোড়ানোর অর্থনীতি

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় আরেকটি নীরব বিপ্লব চলছে। এখানে বন কেটে কাঠ বিক্রির জন্য পাহাড় পোড়ানো হয় না।

পোড়ানো হয় কৃষির জন্য। এক কানি জমি ইজারা পাওয়া যায় এক থেকে দুই হাজার টাকায়। সেখানে কচুর মুখি চাষ করে মৌসুম শেষে লাভ হয় কয়েক গুণ।

ঢাকা ও কুমিল্লার পাইকারি বাজারে এর চাহিদা বাড়ছে। ফলে বন হয়ে উঠেছে কৃষি জমির কাঁচামাল।

একজন চাষি জানান, শুধু তাঁর সঙ্গে এবার প্রায় ৫০ জন চাষ করছেন। আর পরিবহন শ্রমিকদের হিসাব বলছে, কয়েক শ মানুষ এই অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

এটি একটি সমান্তরাল কৃষি শিল্প।

পিটাছড়া বনের ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মী মাহফুজ রাসেল বলছেন, কয়েক বছর আগেও কচুর মুখি চাষ সীমিত ছিল। কিন্তু কাসাভা ও পাম চাষ কমে যাওয়ার পর এটি এখন নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

তার ভাষায়, “রাতারাতি বনে আগুন দিয়ে, শত শত গাছ কেটে কচু চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বন্য প্রাণী ও বনের পাখিরা আবাস হারাচ্ছে। যারা এ চাষের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। না হলে বনের এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য অচিরেই হারিয়ে যাবে।”

সবচেয়ে বড় সংকট: বন আছে, কিন্তু মালিক নেই

বাংলাদেশের বন রক্ষার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। পিটাছড়ার মতো অনেক বন সরকারি বন নয়।

সেগুলো ব্যক্তিগত কবুলিয়তভুক্ত জমি। ফলে বন বিভাগ স্বীকার করছে, আগুন দিয়ে বন পুড়িয়ে ফেললেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের আইনগত হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।

খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, “এগুলো সরকারি বন না হওয়ায় আগুন দিলেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে কিছু করতে পারি না। তবে ব্যাপক আকারে যখন এ ধরনের চাষ হয়, তখন বনের বাস্তুতন্ত্র সংকটে পড়ে যায়।”

অর্থাৎ গাছ আছে। বন্য প্রাণী আছে। বাস্তুতন্ত্র আছে। কিন্তু কার্যত কোনো অভিভাবক নেই।

যে প্রাণীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে

পিটাছড়া বনে তিন বছরের গবেষণায় নথিভুক্ত হয়েছে ১৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৭ প্রজাতির সাপ এবং ৯৩ প্রজাতির পাখি।

এখানে আছে লজ্জাবতী বানর, বনরুই, মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি, রাজগোখরা, বার্মিজ পাইথন।এসব প্রাণী বন পুড়লে কোথায় যায়? তারা লোকালয়ে আসে। মানুষের হাতে মারা পড়ে। অথবা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

রাসেলের ভাষায়, বন পোড়ানোর কারণে বন্য প্রাণী ও পাখিরা আবাস হারিয়ে লোকালয়ে চলে আসছে এবং মানুষের হাতে মারা পড়ছে। এর ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশের বন সংকট আসলে উন্নয়নের সংকট

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত বনভূমির শতকরা হার নয়।

প্রশ্ন হলো— একটি দরিদ্র, জনবহুল, কৃষিনির্ভর দেশ কীভাবে উন্নয়ন করবে, খাদ্য উৎপাদন করবে, কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং একই সঙ্গে বনও বাঁচাবে?

বাংলাদেশের বন আজ কাঠচোরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না। যুদ্ধ করছে উন্নয়ন, বাজার, কৃষি এবং জনসংখ্যার চাপের সঙ্গে। আর সেই যুদ্ধে বন প্রতিদিন একটু একটু করে হেরে যাচ্ছে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাতও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন। তিনি বলেন, “আমরা এসব জমি ইজারা দেওয়া ও পুড়িয়ে নানা ফসলের চাষের খবর পেয়েছি। যেহেতু এসব জমিতে গহিন প্রাকৃতিক বন ও বন্য প্রাণী আছে, তাই বন ও প্রকৃতি রক্ষার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।”

তার মতে, জেলা পরিষদ, বন বিভাগ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

পিটাছড়ার পোড়া পাহাড়, কক্সবাজার রেলপথে হারিয়ে যাওয়া হাতির করিডর, আর বন বিভাগের আটকে থাকা ক্ষতিপূরণ—এগুলো আলাদা ঘটনা নয়। এগুলো একই সংকটের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।

বাংলাদেশে বন রক্ষার প্রশ্ন এখন আর শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়; এটি ভূমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নও। যতদিন সেই বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখা না হবে, ততদিন নতুন গাছ লাগানো হলেও পুরোনো বন হারানোর হিসাবই বড় হয়ে থাকবে।

যেদিন আমরা বুঝতে পারব বন উজাড়ের প্রধান শত্রু শুধু করাত নয়, অর্থনীতির বর্তমান কাঠামোও—সেদিন হয়তো সমাধানের পথও খুঁজে পাওয়া যাবে। তার আগে পর্যন্ত পিটাছড়ার পোড়া পাহাড়গুলো শুধু খাগড়াছড়ির নয়, পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে।