সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পারকি সৈকত: দখলের মহোৎসবে ডুবছে কোটি টাকার পর্যটন স্বপ্ন

লিজের নাম ভাঙিয়ে সরকারি জমি গিলছে ‘পাওয়ারফুল সিন্ডিকেট’
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ৬ জুন ২০২৬ | ১২:৪৮ অপরাহ্ন


বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলীর মিলনস্থলে যেখানে ঢেউয়ের গান কখনো থামে না- সেই পারকি সৈকত আজ এক নীরব যন্ত্রণার সাক্ষী। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত এই সৈকত একদিকে কর্ণফুলী টানেলের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে সরকারের শতকোটি টাকার পর্যটন স্বপ্নের আঁতুড়ঘর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ গলা চেপে ধরেছে দখলদারদের লোভী হাত।

টানেল সার্ভিস এরিয়া থেকে ফুলতলী বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সরকারি খাসজমি আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পতিত জমি এখন দখলদারদের সাম্রাজ্য। সেখানে গড়ে উঠেছে অবৈধ মাছের ঘের, বাণিজ্যিক দোকানপাট আর রেস্তোরাঁ। সদ্য নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সরকারি পর্যটন কমপ্লেক্সের পাশে এই অবৈধ জঞ্জাল যেন সৌন্দর্যের বুকে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন।

‘লিজের’ আড়ালে পাঁচ একর গ্রাস

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। টানেলের জন্য সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা প্রায় পাঁচ একর জমি এককভাবে দখলে রেখেছেন স্থানীয় নুর মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি। শুধু দখলেই ক্ষান্ত নন তিনি- বিশাল মাছের ঘের গড়ার পাশাপাশি প্রতি বছর নির্বিচারে মাটি খনন করে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করে চলেছেন।

জবাবদিহি চাইতে গেলে নুর মোহাম্মদ নির্বিকারভাবে বলেন, “এক সময় এই জায়গা আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে লিজ নিয়েছিলাম।” কিন্তু বৈধতার কোনো নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। পাউবো কর্মকর্তারা সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন- লিজের দোহাই দিয়ে টানেলের অধিগ্রহণকৃত জমি দখলের কোনো আইনি সুযোগই নেই।

‘হাসনাত পার্ক’: উচ্ছেদ থামিয়ে দিল ‘অদৃশ্য হাত’

এর চেয়েও রহস্যময় ঘটনা ঘটেছে ‘হাসনাত পার্ক’ ঘিরে। পাউবোর জমি দখল করে গড়ে ওঠা এই পার্কটি উচ্ছেদে এর আগে একবার উদ্যোগ নেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু এক অদৃশ্য ইশারায় সেই উদ্যোগ মাঝপথেই থমকে যায়।

বর্তমানে পার্কটির দখল নিয়েছেন স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী কৃষক লীগের সভাপতি নুরুল আনোয়ার। সরকারি জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন বাণিজ্যিক স্টোরেজ ও ভেড়ার খামার। পাউবো কর্তৃপক্ষ একাধিকবার উচ্ছেদের নোটিশ ধরিয়ে দিলেও আনোয়ার টলেননি এক বিন্দুও। উল্টো দাবি করছেন, তিনি নাকি বৈধ লিজেই আছেন! পাউবো কর্মকর্তারা এই দাবিও সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন।

সিন্ডিকেটের ছায়ায় ‘লুসাই’ ও ‘মোহনা’

শুধু নুর মোহাম্মদ বা আনোয়ারই নন, সৈকত ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘লুসাই পার্ক’ ও ‘মোহনা পার্ক রিসোর্ট এন্ড রেস্তোরাঁ’ নিয়েও উঠছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় এই স্থাপনাগুলো পাউবোর জমি ও সরকারি খাসজমি গ্রাস করে অবৈধভাবে মাথা তুলেছে।

এদিকে ফুলতলী বেড়িবাঁধের উপর যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা দোকানপাট বাঁধের সৌন্দর্য নষ্টের পাশাপাশি এর কাঠামোগত নিরাপত্তাকেও হুমকিতে ফেলছে। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো- এই অবৈধ দখল টিকিয়ে রাখতে দখলদাররা বেড়িবাঁধের উপর নির্মাণ করেছেন মসজিদও, যাতে উচ্ছেদ অভিযানের সময় ধর্মীয় অনুভূতির ঢাল ব্যবহার করা যায়।

ম্যাজিস্ট্রেট নেই, ইউএনও ফোন ধরেন না

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের আগেও আমরা এই বিশাল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সব ধরনের পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রেট না পাওয়ায় সে সময় অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। তবে এবার আমরা বড়সড় উচ্ছেদ অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছি।”

কথা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে- খুব শীঘ্রই এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে এই ‘শীঘ্রই’ কতটা শীঘ্রই হবে, সে প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত।

সরকারি জমি দখল ও উচ্ছেদের বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সরকারি মুঠোফোনে বারবার ফোন ধরেননি। ব্যক্তিগত ও সরকারি হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত জানতে চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো সাড়া মেলেনি। একজন জনপ্রতিনিধির এই নীরবতা কি নিছক ব্যস্ততা, নাকি এর পেছনে আছে গভীর কোনো অস্বস্তি?

পর্যটন কর্পোরেশনের আশ্বাস

বিষয়টি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান সায়েমা শাহীন সুলতানার নজরে আনা হলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে এই ‘দেখার’ আশ্বাস আদৌ কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেবে কিনা- সেটাই এখন লাখো পর্যটকপ্রেমীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

রাজস্ব শূন্য, ক্ষোভ তুঙ্গে

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিস্তীর্ণ খাসজমি ও অবৈধ স্থাপনা থেকে সরকার এক পয়সা রাজস্বও পাচ্ছে না। অথচ এই জমিতে গড়ে উঠছে কোটি টাকার ব্যবসা- সব লাভ ঢুকছে মুষ্টিমেয় দখলদারের পকেটে।

স্থানীয় পরিবেশবাদী ও পর্যটকরা তাই ক্ষুব্ধ। তাঁদের একটাই দাবি- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে অবিলম্বে এই উচ্ছেদ অভিযান সফল করতে হবে। কারণ পারকির এই অপার সৌন্দর্যকে যদি এখনই বাঁচানো না যায়, তাহলে একদিন শুধু স্মৃতিতেই বেঁচে থাকবে এই সৈকত।