সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

স্যানিটেশন সংকটে সোনাইমুড়ী: পরিবেশে মিশছে ৭৮ শতাংশ মানববর্জ্য

সাজ্জাদুল ইসলাম | প্রকাশিতঃ ৮ জুন ২০২৬ | ১১:১০ অপরাহ্ন


নোয়াখালীর অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল সোনাইমুড়ী পৌরসভার স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরটিতে উৎপাদিত মানববর্জ্যের ৭৮ শতাংশই কোনো প্রকার শোধন ছাড়াই সরাসরি মিশে যাচ্ছে খোলা ড্রেন, খাল, বিল আর লোকালয়ের নিচু জমিতে।

বাকি ২২ শতাংশ বর্জ্য সাময়িকভাবে সেপটিক ট্যাংকে আটকে থাকলেও ধারণক্ষমতা পূর্ণ হওয়ার পর তা অনিরাপদ বর্জ্যে রূপ নিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের “সিটিওয়াইড ইনক্লুসিভ স্যানিটেশন – ফিকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট” সাপোর্ট সেল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় স্যানিটেশন ব্যবস্থার এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে দেশের ৫০টি পৌরসভায় পরিচালিত বিশেষ ‘এসএফডি লাইট’ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সোনাইমুড়ীর এই পরিবেশগত সংকটের বিষয়টি উন্মোচিত হয়।

প্রায় ৫০ হাজার জনসংখ্যার এই পৌর শহরে কোনো কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা কিংবা মানববর্জ্য শোধনাগার নেই। গবেষণার গাণিতিক সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পৌরসভার সর্বোচ্চ ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার সেপটিক ট্যাংক এবং ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার একক পিট ল্যাট্রিন বা রিং-স্ল্যাব পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ব্যবস্থার তদারকি অত্যন্ত দুর্বল।

স্যানিটেশন নীতিমালার তোয়াক্কা না করে শহরের ১১ দশমিক ২ শতাংশ সেপটিক ট্যাংকের নোংরা পানির লাইন সরাসরি পৌরসভার খোলা ড্রেন কিংবা স্টর্ম সুয়ারের সাথে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে মানববর্জ্যের ক্ষতিকর তরল প্রকাশ্যেই খালের পানিতে গিয়ে মিশছে।

পৌরসভার নিজস্ব কোনো কার্যকর আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় ৭৪ শতাংশ বর্জ্যই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তোলার পর সরাসরি খোলা ডোবা বা জলাশয়ে ফেলে দিচ্ছেন। এখনও শহরের ৩৬ শতাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সনাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বালতি-রশি দিয়ে ম্যানুয়ালি মল তোলা হচ্ছে। এছাড়া পৌরসভার নিজস্ব কোনো যান্ত্রিক ভ্যাকুট্যাগ গাড়ি কার্যকর না থাকায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে বেসরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো বর্জ্য শোধনাগার না থাকায় সংগৃহীত মলের শতভাগই অশোধিত থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে ২ দশমিক ৭ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের কোনো ল্যাট্রিন পরিকাঠামোই নেই, যা পরিবেশ দূষণ আরও ত্বরান্বিত করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রেন ও খাল সরাসরি টয়লেটের লাইনের সাথে যুক্ত থাকায় সামান্য বৃষ্টি বা বন্যায় মলমূত্র মিশ্রিত নোংরা পানি মানুষের ঘরের ভেতর, উঠান এবং রাস্তায় চলে আসে। শহরের যেসব খোলা ডোবা বা নিচু মাঠে বর্জ্য ডাম্পিং করা হয়, বন্যার পানিতে সেগুলো সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে বিষাক্ত রোগজীবাণু পুরো এলাকার মিঠাপানির সাথে মিশে যায়।

সোনাইমুড়ীর কৃষি ব্যবস্থার অনেকটাই খালের পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই দূষিত পানি সরাসরি ধান ও সবজি চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে মানববর্জ্যে থাকা ই-কোলাই, সালমোনেলা, কলেরার জীবাণু ও ক্ষতিকর ভাইরাস খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের ডায়রিয়া, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করছে।

এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী জানান, মানববর্জ্য মিশ্রিত পানি সেচ কাজে ব্যবহার হলে তার উপকার ও ক্ষতিকর দুটো দিকই রয়েছে। খালের পানিতে মানববর্জ্য থাকায় সেখানে জৈব সার রয়েছে। তবে সেই পানিতে থাকা ভারী ধাতু ও রাসায়নিক পদার্থ উদ্ভিদ গ্রহণ করে বেড়ে উঠলে ধান এবং সবজির মাধ্যমে সেগুলো মানবদেহে প্রবেশ করার বড় ঝুঁকি থাকে।

পৌর এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মাত্র ৩ থেকে ৬ মিটার গভীরে অবস্থিত। অথচ ৭৪ শতাংশ টয়লেট বসানো হয়েছে ঘরের খাবার পানির নলকূপের মাত্র ১০ মিটারের মধ্যে। ফলে বন্যার সময় অগভীর নলকূপগুলোর চারপাশ বর্জ্যের পানিতে ডুবে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো ভোলেনি সোনাইমুড়ী পৌর এলাকার মানুষ। সেসময় ড্রেনের কালো নোংরা পানির সাথে মানুষের মলমূত্র ভেসে ঘরের উঠানে চলে আসতো। সোনাইমুড়ী বাজারের ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, বন্যার পর এই দূষিত পানি পায়ে লাগায় তাকে ভয়াবহ চর্মরোগের শিকার হতে হয়েছে। তার পরিবারের অনেকেরই এই দূষিত পানির কারণে পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে খোসপাঁচড়া দেখা দিয়েছিলো।

গবেষকদের এই প্রতিবেদন ২০২৩ সালের মে মাসে প্রস্তুত হলেও এটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ড্রেনে অবৈধ সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে পৌর প্রশাসনের বড় কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে কথা বলতে সোনাইমুড়ী পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরিন আকতারের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে সোনাইমুড়ী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, পৌরসভার আধুনিক ডাম্পিং সেন্টার নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই তা উদ্বোধন হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে সোনাইমুড়ী পৌরসভাকে দুটি ভ্যাকুট্যাগ গাড়ি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, বর্জ্য শোধনাগার চালু হলে সেখানে মানববর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন করা হবে, যা বর্তমান সংকটের অনেকাংশে সমাধান করবে।