সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ই-হেলথ কার্ড: ২৫ লাখ মানুষের হাতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, চট্টগ্রাম কবে পাবে?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১০ জুন ২০২৬ | ১২:৪৩ অপরাহ্ন


ধরুন, চট্টগ্রামের কোনো প্রত্যন্ত উপজেলার একজন মা তাঁর অসুস্থ শিশুকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেছেন। ডাক্তার বদলি হয়েছেন, নতুন ডাক্তার শিশুটির আগের চিকিৎসার ইতিহাস জানেন না। একই পরীক্ষা আবার করতে হচ্ছে, আবার টাকা খরচ হচ্ছে। এই চিরচেনা দুর্ভোগের দিন শেষ করতেই আসছে ই-হেলথ কার্ড। তবে চট্টগ্রামের মানুষকে এখনো অপেক্ষা করতে হবে। কারণ পাইলট প্রকল্পের তালিকায় এই বিভাগীয় শহর এখনো নেই।

কী এই ই-হেলথ কার্ড?

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লাখ মানুষের জন্য ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির অংশ হিসেবে এই কার্ড হবে একজন নাগরিকের সম্পূর্ণ ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র।

জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত এই কার্ডে সংরক্ষিত থাকবে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, রোগ নির্ণয়ের তথ্য, প্রেসক্রিপশন, টিকাদান তথ্য, এমনকি মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই কার্ড দেখালেই মিলবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সেবা।

কোথায় শুরু হচ্ছে, কত টাকা বরাদ্দ

প্রথম পর্যায়ে খুলনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী ও নোয়াখালী- এই পাঁচ জেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এজন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৬২ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা- অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রয়েছে- ১২ হাজার কোটি টাকার জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সম্প্রসারণ, ৭ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক, ৫ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার সেকেন্ডারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ।

চট্টগ্রাম কেন তালিকায় নেই?

বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য ভিড় করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। দীর্ঘ লাইন, একই পরীক্ষা বারবার করার ভোগান্তি, চিকিৎসা ইতিহাস হারিয়ে যাওয়া- এ সমস্যাগুলো এখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা। পাশাপাশি বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ থেকে আসা রোগীরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত।

এই বাস্তবতায় পাইলট প্রকল্পে চট্টগ্রাম বিভাগকে না রাখাটা অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকার পরে চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ বিভাগীয় শহরে এ ধরনের পাইলট প্রকল্প চালালে অভিজ্ঞতা হতো আরও বাস্তবসম্মত এবং জাতীয়ভাবে প্রয়োগযোগ্য।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও বিশেষজ্ঞরা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সতর্ক করেছেন।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, “ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প স্বাস্থ্য খাতে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। সফল হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমাভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হবে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “শুধু কার্ড বিতরণ করলেই হবে না। হাসপাতালের সক্ষমতা, চিকিৎসক ও নার্সের প্রাপ্যতা, ওষুধ সরবরাহ এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।”

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরিচিত করানো- এই তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে না পারলে সুন্দর এই উদ্যোগ কাগজেই থেকে যাবে।

পরবর্তী পরিকল্পনা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমার সঙ্গেও এই কার্ড যুক্ত করার কথা ভাবছে সরকার।

পাঁচ জেলার পাইলট সফল হলে চট্টগ্রামসহ সারাদেশের মানুষও একদিন এই সুবিধার আওতায় আসবেন- সেই প্রতিশ্রুতি এখন বাজেটের পাতায়। তা বাস্তবে রূপ নেবে কিনা, সেটা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের সদিচ্ছা আর প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর।