সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বাঁশির শেষ সুরে থামল ৩৬ বছরের পথচলা

মাঠকে বিদায় জানালেন রেফারি মাস্টার নাছির আহমদ
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১১ জুন ২০২৬ | ৭:০৬ অপরাহ্ন


একটি বাঁশি, একজোড়া বুট আর ফুটবলের প্রতি অগাধ ভালোবাসা- এই তিনকে সঙ্গী করেই কেটে গেছে জীবনের ৩৬টি অমূল্য বছর। শত শত ফুটবল ম্যাচের শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে যে মানুষটির বাঁশির নির্দেশে থামত বিতর্ক, শুরু হত উত্তেজনার ঢেউ- সেই মানুষটি আজ মাঠকে বিদায় জানিয়েছেন। মাঠে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতার প্রতীক এই মানুষটির নাম মাস্টার নাছির আহমদ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) লোহাগাড়া উপজেলার সদরে অবস্থিত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম স্টেডিয়ামে আয়োজিত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল প্রীতি ম্যাচের প্রথম দশ মিনিট পরিচালনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। দর্শক, খেলোয়াড় ও সংগঠকদের হৃদয়ে এক আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দিয়ে, তিন যুগেরও বেশি সময়ের গৌরবময় পথচলার ইতি টানলেন এই কিংবদন্তি রেফারি।

“মাঠই ছিল আমার দ্বিতীয় পরিবার”

অবসরের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাস্টার নাছির আহমদ। কণ্ঠে জড়িয়ে আসা আবেগ সামলে তিনি বলেন, “ফুটবল মাঠই ছিল আমার দ্বিতীয় পরিবার। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে মাঠে। অসংখ্য খেলোয়াড়কে বড় হতে দেখেছি, অনেকের সাফল্যের সাক্ষী হয়েছি। আজ যখন অবসরের কথা ভাবি, তখন বুকের ভেতর একটা শূন্যতা কাজ করে- মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে প্রিয় একটি অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠায় এসে দাঁড়িয়েছি।”

তিনি আরও যোগ করেন, “রেফারিং শুধু দায়িত্ব ছিল না, এটা ছিল আমার ভালোবাসা, আমার আবেগ। কখনো ঝড়-বৃষ্টি, কখনো প্রচণ্ড রোদ- সবকিছুকে উপেক্ষা করে মাঠে ছুটে গেছি। কারণ মাঠের ডাক আমি কখনো উপেক্ষা করতে পারিনি। আজ অবসরে যাচ্ছি, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কোনোদিন শেষ হবে না।”

তিন যুগের অক্লান্ত যাত্রা

৩৬ বছর আগে শুধুমাত্র ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই রেফারিং পেশায় যুক্ত হন মাস্টার নাছির আহমদ। ধীরে ধীরে উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পৌঁছে যান আরও বড় মঞ্চে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট, অসংখ্য ফাইনাল ম্যাচ এবং স্মরণীয় ক্রীড়া আয়োজন পরিচালনা করে অর্জন করেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্মান। মাঠে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত ও কঠোর শৃঙ্খলার জন্য খেলোয়াড়দের কাছে যেমন ছিলেন গভীরভাবে সম্মানিত, তেমনি আয়োজকদের কাছেও ছিলেন অকুণ্ঠ আস্থার প্রতীক।

সকলের চোখে কিংবদন্তি

তরুণ ফুটবলার নাফিজ আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, “ছোটবেলা থেকে মাঠে তাঁকে দেখে বড় হয়েছি। তাঁর বাঁশির শব্দ আমাদের কাছে ফুটবলেরই একটি অংশ ছিল। আজ তিনি অবসরে যাচ্ছেন- এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”

ক্রীড়া সংগঠক ও খেলোয়াড় মোজাফফর আহমদ বলেন, “যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রথম পছন্দ ছিলেন মাস্টার নাছির আহমদ। তাঁর অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতা খেলার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করত। তাঁর অবসরে মাঠ হারাচ্ছে শুধু একজন রেফারিকে নয়- হারাচ্ছে একজন অভিভাবককে।”

দীর্ঘদিনের সহকর্মী রেফারি নাছির উদ্দিন গভীর শ্রদ্ধায় বলেন, “মাস্টার নাছির আহমদ শুধু একজন দক্ষ রেফারিই নন, তিনি মাঠের শৃঙ্খলা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাঠে তাঁর বাঁশির সুর আর শোনা না গেলেও ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা

লোহাগাড়া উপজেলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এস এম চিশতী আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই মাঠে তাঁর বাঁশির সুর, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা দেখে বড় হয়েছি। একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তিনি সবসময় আমার পাশে থেকেছেন। আজকের এই বিদায়ী সংবর্ধনা তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ মাত্র- মাঠে রেফারির দায়িত্ব থেকে অবসর নিলেও তিনি ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে আগের মতোই সক্রিয় থাকবেন বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”

লোহাগাড়া ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব কুতুব উদ্দিন বলেন, “মাস্টার নাছির আহমদের মতো নিবেদিতপ্রাণ রেফারি খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু খেলা পরিচালনা করেননি, বরং নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের জন্য চিরকাল অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।”

কিছু অবদান কখনো অবসর নেয় না

৩৬ বছরের দীর্ঘ পথচলার শেষে হয়তো আর দেখা যাবে না রেফারি মাস্টার নাছির আহমদকে বাঁশি হাতে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস- মাঠে তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও তাঁর শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও অবদান আগামী দিনের ফুটবলকে পথ দেখিয়ে যাবে।

কারণ কিছু মানুষ অবসরে যান, কিন্তু তাঁদের অবদান কখনো অবসর নেয় না। মাস্টার নাছির আহমদ তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম- যা উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে, যুগের পর যুগ।