সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

রাতের চট্টগ্রামে জাতীয় ক্রিকেটার নাঈমের সঙ্গে যা ঘটল

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৩ জুন ২০২৬ | ৯:৪২ পূর্বাহ্ন


শুক্রবার, রাত তখন সাড়ে এগারোটা। সাভারে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষে ক্লান্ত শরীরে বিমানে চেপেছিলেন নাঈম হাসান। গন্তব্য চট্টগ্রামের নিজ বাড়ি। বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিতে উঠলেন। ভাবলেন, আর কিছুক্ষণ পরেই ঘরে পৌঁছাবেন।

লালখান বাজার মোড়ে সিএনজি থামল। নাঈম নামলেন। আর তখনই শুরু হলো এক দুঃস্বপ্নের রাত।

যে রাত ভুলতে পারবেন না

কয়েকজন লোক এগিয়ে এলেন। চেক করার কথা বললেন। নাঈম বাধা দেননি। সহযোগিতার হাত বাড়ালেন। কিন্তু কথা বলার সুযোগ পেলেন না। পাশে থাকা দুজন তার পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেন। উত্তর এলো ধমকে- “তুই আসামি, তুই চুপ থাক।”

এরপর যা ঘটল, তা নাঈম নিজেই বললেন: “গলা চিপে ধরে আমাকে সিএনজিতে উঠাইছে। আমি বের হওয়ার চেষ্টা করলে দুইজন আমাকে চেপে ধরে আরেকজন মারধর করতে থাকে পাইপ দিয়ে।”

ততক্ষণে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়েছেন প্রায় একশত মানুষ। অনেকে চিনতে পেরে বলার চেষ্টা করলেন- ইনি জাতীয় দলের ক্রিকেটার। তবু থামল না মারধর।

থানায় গিয়েও রেহাই নেই

খুলশী থানায় নেওয়ার পরও যন্ত্রণার শেষ হলো না। নাঈমের ভাষ্য, “থানায় আনার পর দ্বিতীয় দফা হেনস্তা করা হয়। ওসির সামনেও আমাকে নাজেহাল করা হয়েছে। কিল, ঘুষি ও লাথি মারা হয়েছে।”

থানার ওসি আরিফুল ইসলামের কথায়, এসআই শফিক একটি সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে নাঈমকে থানায় নিয়ে আসেন- তথ্যটি ছিল চোরাচালান সংক্রান্ত। তবে তাকে না জানিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

পরিস্থিতি বদলাল যখন নাঈমের পরিচিতজনদের ফোন আসতে শুরু করল। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল, পরিচালক ঈসরাফিল খসরু- একে একে ফোন যেতে লাগল ওসির কাছে। তখন টনক নড়ল। নাঈম জানান, “ওসি বললেন, ভুল হয়ে গেছে।”

মোবাইল ফেরত পেয়ে নাঈম ছুটলেন হাসপাতালে। আনলেন মেডিকেল রিপোর্ট।

ঘটনার পর থানায় আসেন নগর পুলিশের একজন উপকমিশনার। প্রাথমিক তদন্তে এসআই শফিকের ভুল প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ক্লোজ করা হয়েছে বলে জানান ওসি।

ক্রিকেটাঙ্গন সরব, পরিবার ক্ষুব্ধ

ঘটনাটি রাতারাতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রিকেটাঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে যদি এমন হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের অবস্থা কী?

বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন নাঈমকে ফোন করে জানিয়েছেন, দেশের সকল ক্রিকেটার তার পাশে আছেন। সংগঠনটি বলেছে- “এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন জাতীয় ক্রিকেটারের জন্য নয়, দেশের যেকোনো নাগরিকের ক্ষেত্রেই অগ্রহণযোগ্য।”

নাঈমের বাবা মাহবুব আলম, বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর, ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন, “অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে হবে। এটা যতক্ষণ না হবে আমরা থানা ছাড়বো না। বাকি খেলোয়াড়রা যদি থানা ঘেরাও করে আমরা দায় নেবো না।”

প্রশ্ন যে থেকে যায়

চোরাচালানের সন্দেহ। একটি তথ্য। একটি রাত। এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে যা ঘটল, তাতে শুধু একজন ক্রিকেটারের শরীরে আঘাত লাগেনি, আঘাত লেগেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মর্যাদায়।

যে প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে জরুরি সেটা হলো- পরিচয় নিশ্চিত না করে, যাচাই না করে, একজন নির্দোষ মানুষকে পাইপ দিয়ে পেটানোর এই সংস্কৃতি কবে বদলাবে? এসআই শফিককে ক্লোজ করা হয়েছে। কিন্তু এটুকুই কি যথেষ্ট?

নাঈম হাসান আশ্বস্ত হয়েছেন, বিচার হবে। এখন দেখার পালা, সেই প্রতিশ্রুতি কেবল কথায় থাকে, নাকি কাজেও প্রমাণ হয়।