সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

স্বপ্ন বেচে দাসত্ব কিনলেন, দেশে ফিরলেন ৯১ জন

ভালো চাকরির স্বপ্ন নিয়ে গেলেন, ফিরলেন শরীরে নির্যাতনের দাগ নিয়ে
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৩ জুন ২০২৬ | ৭:৪৫ অপরাহ্ন


ভালো চাকরির স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। ফিরে এলেন শরীরে নির্যাতনের দাগ, মনে আতঙ্কের ছায়া আর পকেটে শূন্যতা নিয়ে। কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরো ৫৪ জন বাংলাদেশি শনিবার দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।

এর আগের দিন ফিরেছিলেন ৩৭ জন। দুই দিনে মোট ৯১ জন। এই ৯১টি মানুষের গল্প আলাদা। কিন্তু যন্ত্রণা একটাই।

যেভাবে পাতা হয় ফাঁদ

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বৈধ ছাড়পত্র নিয়ে তারা গিয়েছিলেন। কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পা রাখতেই শুরু হয় আসল অধ্যায়।

বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষায় থাকেন বাংলাদেশি দালাল। হাসিমুখে এগিয়ে আসেন। কয়েকদিন নিজের বাসায় রাখেন। তারপর একদিন বলেন- চলো, কাজে যাবে।

শনিবার ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী জানালেন তার অভিজ্ঞতা। ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ফ্লাইট ছিল তার। দুই দিন মালয়েশিয়ায় ট্রানজিট শেষে ৭ ডিসেম্বর কম্বোডিয়ায় পৌঁছান। বিমানবন্দরে রবিন শেখ নামের এক বাংলাদেশি তাকে রিসিভ করেন।

২৩ ডিসেম্বর কম্পিউটারের কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় এক কোম্পানিতে। পরের দিন কাজে যোগ দিয়ে বুঝতে পারেন, এটি স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম। বিদেশিদের সাথে প্রতারণা করে টাকা আনাই কাজ।

কাজ করতে অস্বীকার করলে চীনা বস জানান ঘটনার আসল রহস্য- দালাল রবিন শেখ তাকে ২ হাজার ৮৫ ডলারে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই টাকা না দিলে পাসপোর্ট মিলবে না, বের হওয়া যাবে না।

আরেক ভুক্তভোগীর গল্পটা আরো নির্মম। সেদেশে বিয়ে করে থিতু হওয়া এক বাংলাদেশি দালাল তাকে সুপারশপে চাকরির কথা বলে নিয়ে গেছেন। পাঁচ মাস কাজও করিয়েছেন, মাসে মাত্র ৪০০ ডলারে। থাকা-খাওয়ার পর হাতে কিছুই থাকত না। পরিবার চাপ দিতে শুরু করলে একদিন ‘ভালো কোম্পানিতে চাকরি’র প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হলো স্ক্যাম সেন্টারে।

কম্পাউন্ডের ভেতরে যা ঘটত

স্ক্যাম কম্পাউন্ড মানে খাঁচা। বাইরে থেকে দেখলে অফিস। ভেতরে ঢুকলে জেলখানা। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। বাইরের জগতের সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

এরপর শুরু হয় কাজ। মূলত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের টার্গেট করে অনলাইনে ফাঁদ পাতা হয়। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে শারীরিক নির্যাতন। মানসিক চাপ। হুমকি।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগি পরিচালক শরিফুল হাসান বলছেন, “সাইবার স্ক্যাম মানবপাচারের ভয়াবহ একটা ধরন। অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়।”

এটি প্রথম নয়, শেষও নয়

শনিবারের এই ৫৪ জনের আগেও এসেছেন অনেকে। গত ১২ জুন কম্বোডিয়া থেকে ফিরেছিলেন ৩৭ জন। এই বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমার থেকে ফিরেছিলেন ৮ জন। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ফিরেছিলেন আরো ১৮ জন, থাইল্যান্ড সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে ঢোকানো হয়েছিল তাদের।

প্রতিবারই একই কাহিনি। প্রতিবারই একই যন্ত্রণা।

শরিফুল হাসান বলছেন, “পরপর দুদিন মিলিয়ে ৯১ জনের ফেরত আসা প্রমাণ করে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।”

যে ফাঁদ এখনো পাতা আছে

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম- সর্বত্র বিজ্ঞাপন চলছে। কম্পিউটার অপারেটর চাই, কলসেন্টার এজেন্ট চাই, আকর্ষণীয় বেতন। ভুয়া ওয়েবসাইট, ভুয়া ইমেইল- সব সাজানো। সরকার ও ব্র্যাক বারবার সতর্ক করেছে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া নিয়ে। তবু প্রতিদিন কেউ না কেউ ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

কারণ একটাই- স্বপ্ন। ভালো চাকরির স্বপ্ন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন।

আর সেই স্বপ্নকেই অস্ত্র বানিয়ে শিকার করছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র।

ফিরে আসা ৯১ জনকে বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা ও বাড়ি ফেরার অর্থ দিয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?