
প্রাণ-আরএফএল সিদ্ধান্ত নিয়েছে হবিগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাবে। শতকোটি টাকার বিনিয়োগ। পরিকল্পনা পাকা। কিন্তু থমকে আছে একটাই কারণে- সরকার এখনো বলেনি, এই বিদ্যুৎ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিতে কত টাকা লাগবে।
মোবাইল অপারেটর রবি চায় তার সব টাওয়ারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে। সেই উদ্যোগও ঝুলে আছে একই কারণে।
আর ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে- নইলে গুনতে হবে কার্বন ট্যাক্স। শুধু একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএমের কারখানার চাহিদাই আড়াই হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সেই বিদ্যুৎ সরবরাহের পথটাই এখন বন্ধ।
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, নীতিতে।
যে জায়গায় আটকে আছে সব
বেসরকারি কোম্পানি সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ বানালে সেটা সরকারি লাইন ব্যবহার করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। এই ব্যবস্থাকে বলে ‘মার্চেন্ট পাওয়ার’। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট চার্জ- যাকে বলে ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’- ঠিক করতে হয়।
এই চার্জটি ঠিক করার দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের- সংক্ষেপে বিইআরসি। কিন্তু বিইআরসি এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আর এই না-পারার পেছনে আছে সরকারি বিতরণ কোম্পানিগুলোর তীব্র আপত্তি।
তাদের যুক্তি সহজ- বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানি সরাসরি শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ বেচলে সরকারি কোম্পানির বড় গ্রাহক চলে যাবে। রাজস্ব কমবে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা চাইছে মোটা ট্যারিফ- কোনো কোনো লাইনে প্রতি ইউনিটে ৩ টাকা ৭৩ পয়সা পর্যন্ত।
সংখ্যার হিসাব
প্রস্তাবে দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ১৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত ট্যারিফ চেয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের বিতরণ কোম্পানি নেসকো সর্বোচ্চ ২ টাকা ৯০ পয়সা দাবি করেছে। এর সাথে যোগ হবে সঞ্চালন লাইনের জন্য আলাদা চার্জ- ৪৬ থেকে ৭৯ পয়সা। আর শক্তি ব্যবস্থাপনার জন্য আরো ৫ পয়সা।
সব মিলিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৩ টাকার বেশি চার্জ। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বলছেন, এত বেশি চার্জ দিয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবসা করা সম্ভব নয়।
নীতিমালায়ও ফাঁক
শুধু ট্যারিফ নয়, নীতিমালাতেও আছে গলদ। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নিজেই স্বীকার করেছেন, বেসরকারি কোম্পানির উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ সরকারি পিডিবি কিনবে কিনা, কিনলে কীভাবে কিনবে- সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা বা নীতিমালা নেই। বিনিয়োগকারীরা এই অনিশ্চয়তায় এগোতে পারছেন না।
পিডিবির একটি কমিটি ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্ট দিয়েছে- সরকারি লাইন ব্যবহার করে বেসরকারি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ পরিবহন সম্ভব। কিন্তু সেই রিপোর্টও পড়ে আছে। আর এপ্রিলে জমা দেওয়া ট্যারিফ প্রস্তাবের ওপর যে শুনানি হওয়ার কথা, তা-ও এখনো হয়নি।
সময় ফুরিয়ে আসছে
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের সব বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসতে হবে। না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ট্যাক্সের মুখে পড়বে বাংলাদেশ।
২০৩০ সাল মানে হাতে সময় মাত্র কয়েক বছর। আর এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব জমা পড়েছে। কিন্তু একটি ট্যারিফ সিদ্ধান্তের অভাবে পুরো খাতটাই অপেক্ষায়।
বিইআরসির চেয়ারম্যান বিতরণ কোম্পানির যুক্তি মানতে রাজি নন। তিনি বলেছেন, রাজস্ব কমার ভয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ আটকে রাখা যাবে না। কিন্তু সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
এদিকে প্রাণ-আরএফএল অপেক্ষায়। রবি অপেক্ষায়। পোশাক খাত অপেক্ষায়। আর সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।