সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ফাটল ধরা ছাদের নিচে পাঠশালা, বৃষ্টি এলে ক্লাস বন্ধ

ঘূর্ণিঝড়ের আশ্রয়কেন্দ্র নিজেই এখন বিপদের উৎস
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৪ জুন ২০২৬ | ৬:০৬ অপরাহ্ন


বৃষ্টি নামলেই ক্লাস বন্ধ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই নিচতলায় এসে গাদাগাদি করে বসেন। কারণ ওপরে থাকা যায় না- ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। দেয়ালে বড় বড় ফাটল। পলেস্তারা খসে পড়ছে। জানালা নেই।

এই ভবনেই প্রতিদিন পাঠ নিচ্ছে কয়েকশ শিশু।

বাঁশখালীর উপকূলীয় ছনুয়া হোছাইনিয়া দাখিল মাদ্রাসার ছবিটা এটুকুতেই শেষ নয়। ২০ জন শিক্ষকের জায়গায় আছেন মাত্র ১০ জন। একটি ল্যাপটপ নেই, একটি প্রিন্টারও নেই। আইসিটির শিক্ষক নেই। আর ভবনের অবস্থা এতটাই নাজুক যে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

চল্লিশ বছরের পুরনো ভবন, একটুও সংস্কার নেই

১৯৮৩ সালে ছনুয়া মনুমিয়াজী পরিবারের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল এই মাদ্রাসা। ছনুয়া ইউনিয়নের একমাত্র এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি। দশকের পর দশক ধরে এই এলাকার হাজারো শিশু এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বেরিয়েছে।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভবনে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি। বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থেকে ভবনটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছকিনার কথায় বেরিয়ে আসে ভেতরের চিত্র, “বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। ওয়াশরুম নেই, একাডেমিক ভবনের সংকট আছে।”

আর অষ্টম শ্রেণির পারভেজ বলছে আরেকটি বাস্তবতার কথা, “বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করলেও আমাদের মাদ্রাসায় একজন আইসিটি বিষয়ের শিক্ষকও নেই।”

যে ভবনে মানুষ আশ্রয় নেয়, সেটাই এখন বিপদের উৎস

এই মাদ্রাসাটির আরেকটি পরিচয় আছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় এটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর বিপদ সংকেত দিলে আশপাশের অসংখ্য মানুষ গবাদিপশু নিয়ে এখানে ছুটে আসেন।

কিন্তু যে ভবনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, দেয়ালে ফাটল ধরেছে- সেই ভবনে আশ্রয় নেওয়া মানে নিরাপদ আশ্রয় নয়, জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মজিদ বলছেন, “প্রতি বছর বর্ষায় ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ সংকেত দিলে অসংখ্য মানুষ গবাদিপশু সহ এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয় নেন।”

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে- কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্য।

অন্ধকারে আলো জ্বাললেন একজন

দীর্ঘদিন এই মাদ্রাসায় বিদ্যুৎ সংযোগই ছিল না। গরমের দিনে শ্রেণিকক্ষে বসে ঘামতে ঘামতে পড়াশোনা করতে হতো শিক্ষার্থীদের।

এই অবস্থায় এগিয়ে এলেন এলাকার সমাজহিতৈষী লায়ন মো. আমিরুল হক এমরুল কায়েস। নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করলেন। উপহার দিলেন ৮টি উন্নতমানের সিলিং ফ্যান।

একটু বাতাস পেয়ে শিক্ষার্থীরা স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু ফাটল ধরা ছাদ, ভাঙা দেয়াল আর শিক্ষকের অভাব- এগুলো তো একজন মানুষের পক্ষে সারানো সম্ভব নয়।

মাদ্রাসা সুপারের হাহাকার

মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আবদুর রশিদের কথায় ফুটে উঠছে একজন শিক্ষকের অসহায়ত্ব।

“আমাদের এখানে একটি প্রিন্টার কিংবা ল্যাপটপও নেই। অফিসের প্রয়োজনীয় কাজ করতে বাইরে যেতে হয়। মাত্র ১০ জন শিক্ষক দিয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বৃষ্টির সময় সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে নিচতলায় নেমে আসতে হয়।”

১০ জন শিক্ষক, পাঁচশোরও বেশি শিক্ষার্থী। গড়ে একজন শিক্ষকের কাঁধে ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর ভার। এই পরিস্থিতিতে মানসম্পন্ন শিক্ষা কতটুকু সম্ভব- প্রশ্নটা থেকেই যায়।

কর্তৃপক্ষের জবাব

উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার এয়ার মুহাম্মদ জানালেন, মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নাম পাঠিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। বললেন, “আশা করি ভালো কিছু হবে।”

আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিনের জবাব আরও চমকে দেওয়ার মতো; তিনি বললেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি “অবগত নন।” সুপারকে যোগাযোগ করতে বললেন। আর জানালেন, বড় বিষয় হলে সেটা “লং প্রসেসিং।”

পাঁচশো শিশু প্রতিদিন ফাটল ধরা ছাদের নিচে বসছে। আর প্রশাসন বলছে, “লং প্রসেসিং।”

যা না বললেই নয়

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদানের জায়গা নয়, এটি একটি এলাকার ভবিষ্যৎ গড়ার কেন্দ্র। ছনুয়া হোছাইনিয়া দাখিল মাদ্রাসা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এই উপকূলীয় এলাকার একমাত্র এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা।

এখানে যারা পড়ছে, তারা এই এলাকার সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তান। তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।

ভবন ভেঙে পড়লে কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হলে, তখন হয়তো তদন্ত কমিটি বসবে। রিপোর্ট লেখা হবে। কিন্তু যে শিশুগুলো আহত হবে, যাদের জীবন বিপন্ন হবে, তাদের ফিরিয়ে আনা যাবে না।

তার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এখনই।