সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

লাশ বের করতে পারছিলেন না, কারণ বেড়িবাঁধে কাদা

কাদার নরকে মহতরপাড়া, বেড়িবাঁধের অসমাপ্ত কাজে আনোয়ারায় জনদুর্ভোগ চরমে
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ১৫ জুন ২০২৬ | ২:১০ অপরাহ্ন


মানুষটি মারা গেছেন। প্রতিবেশীরা এলেন শেষ বিদায় দিতে। খাটিয়া কাঁধে নিলেন। কিন্তু এগোতে পারছেন না। বেড়িবাঁধের কাদা এতটাই গভীর যে লাশ নিয়ে বের হওয়ার পথ নেই।

এই দৃশ্য আনোয়ারার চাতরী ইউনিয়নের মহতরপাড়ার। এখানে চলছে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। চলছে মানে— আধা করা অবস্থায় পড়ে আছে। অর্ধেক অংশে মাটি ফেলা হয়েছে, বাকি অর্ধেক হয়নি। বৃষ্টি নামলেই পুরো রাস্তা পরিণত হয় কাদার নরকে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইলিয়াছ যখন কথা বলছিলেন, তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব একসাথে মিশে ছিল।

“গত পরশু দিন আমাদের এক প্রতিবেশী মারা যান। বেড়িবাঁধের কাদার কারণে খাটিয়া নিয়ে লাশ বের করতেও আমাদের চরম বেগ পেতে হয়েছে।”

একটু থামলেন। তারপর বললেন, “ঠিকাদারের চরম গাফিলতির কারণেই আজ আমাদের এই নরকযাতনা ভুগতে হচ্ছে।”

মৃত মানুষকে শেষযাত্রায় বিদায় দেওয়ার মতো সামান্য সুযোগটুকুও নেই এই এলাকায়। এর চেয়ে বড় দুর্ভোগের ছবি আর কী হতে পারে?

অভিযোগের জবাবে ঠিকাদার রফিক মাস্টার দায় নিজের কাঁধে নিলেন না। উল্টো ক্ষোভ ঝাড়লেন স্থানীয়দের ওপর।

তাঁর কথায়, “এলাকার বাসিন্দারা আমাকে কাজে কোনো ধরনের সহযোগিতা করছেন না। বাইর থেকে মাটি এনে এখানে কাজ করা অত্যন্ত মুশকিল।”

তবে স্থানীয়রা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের প্রশ্ন- কাজ যদি চলমানই থাকে, তাহলে এত দিনেও শেষ হচ্ছে না কেন? বৃষ্টির আগেই কেন সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? মাটি ফেলে রেখে রাস্তা কাদার ফাঁদে পরিণত করার দায় কার?

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এই প্রকল্প তাদের নয়- উপজেলা প্রশাসনের। আনোয়ারার ইউএনও মো. মহিন উদ্দীন বললেন, “বিষয়টি আমি গুরুত্বের সাথে দেখছি। জনগণের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত কাজ শেষ করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

আশ্বাস এলো। কিন্তু মহতরপাড়ার মানুষ জানেন, আশ্বাসে কাদা শুকায় না।

বৃষ্টি আসবে। কাদা জমবে। আর সেই কাদার মধ্যে দিয়েই তাদের প্রতিদিন কাজে যেতে হবে, বাজারে যেতে হবে, সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে হবে। কেউ মারা গেলে— লাশ বের করতেও লড়াই করতে হবে।

এখন স্থানীয়দের দাবি একটাই— এখনই কাজ শেষ করুন। ঠিকাদারের গাফিলতি আর প্রশাসনের ঢিলেমির মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সেই মাশুল আর কতদিন?

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে যদি মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়নের মানে কী?