
পিতার হাতের স্নেহ সন্তান ভোলে না- এই কথা সত্য। কিন্তু বাঁশখালীর এই গল্পে সন্তান ভুলেছে। শুধু ভোলেনি, সেই বাবাকেই পরিকল্পনা করে হত্যা করেছে। শরবতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করেছে। তারপর নির্জন রাস্তায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাস বন্ধ করে দিয়েছে। লাশ ফেলে গেছে ঝোপের আড়ালে।
কারণ? সম্পত্তি।
দুই বছর সেই সত্য চাপা ছিল। গত ১৩ জুন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উন্মোচিত হলো পুরো ষড়যন্ত্রের জাল।
একজন বাবুর্চির শেষ যাত্রা
মীর মজিবুর রহমান খান। বাঁশখালীর পূর্ব চাম্বলের মানুষ। সারাজীবন বাবুর্চির পেশায় সংসার চালিয়েছেন। জীবনের শেষ বেলায় চট্টগ্রাম নগরে মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন।
২০২৪ সালের ৭ জুন আর ফেরেননি।
মেয়ে উদ্বিগ্ন হলেন। খুঁজলেন। থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করলেন। আদালতের দরজায় গেলেন। কিন্তু বাবার কোনো খোঁজ মিলল না।
দুই দিন পর, ৯ জুন, হালিশহর থানা পুলিশ নগরের সিডিএ আউটার রিং রোডের পাশের ঝোপ থেকে একটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করল। পরিচয় মিলল না। ময়নাতদন্ত শেষে দাফন হলো সেই লাশ। মামলার তদন্ত একসময় চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পাতায় থেমে গেল।
মজিবুর রহমান ‘নিখোঁজ’ হিসেবেই রয়ে গেলেন।
যেভাবে সাজানো হয়েছিল ফাঁদ
পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক সুপরিকল্পিত হত্যার ছক।
মজিবুর রহমানের বড় ছেলে বেলাল হোসেন। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল বাবার সঙ্গে। সেই বিরোধ মেটাতে বেলাল বেছে নিয়েছিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর পথ।
পরিকল্পনাটা ছিল এরকম- একজন নারীকে ব্যবহার করা হলো। সেই নারী বৃদ্ধ মজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের অভিনয় করলেন। সেই কৃত্রিম সম্পর্কের টানেই ৭ জুন নগরের বাকলিয়ার একটি বাসায় গেলেন মজিবুর রহমান।
সেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিলেন সহযোগী আব্দুল জলিল।
শরবত আনা হলো। তাতে মেশানো ছিল ঘুমের ওষুধ। সেটা খেয়ে অচেতন হয়ে পড়লেন বৃদ্ধ বাবা। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো নগরের বিভিন্ন স্থানে। সন্ধ্যা নামার পর হালিশহরের সিডিএ আউটার রিং রোডের নির্জন এলাকায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হলো।
মীর মজিবুর রহমান খান সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন।
নিথর শরীরটা ঠেলে দেওয়া হলো রাস্তার পাশের ঝোপে।
দুই বছর পর সত্যের মুখোমুখি
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো দীর্ঘ তদন্ত চালাল। একে একে জোড়া লাগল সব সুতো। গত ১৩ জুন কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হলেন বেলাল হোসেন।
জিজ্ঞাসাবাদে ভেঙে পড়লেন। স্বীকার করলেন নিজের বাবাকে হত্যার কথা। আদালতে ১৬৪ ধারায় দিলেন জবানবন্দি। তার তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হলেন সহযোগী আব্দুল জলিল।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুই বছর আগে উদ্ধার হওয়া সেই অজ্ঞাতনামা মরদেহই ছিল মীর মজিবুর রহমান খানের। আলামত ও আসামিদের তথ্য মিলিয়ে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। হত্যায় ব্যবহৃত নারী সহযোগীর পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে, তবে তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
যে প্রশ্ন থেকে যায়
একজন বাবা ছেলের পাতা ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিলেন। দুই বছর অজ্ঞাত লাশ হয়ে মাটিতে শুয়ে রইলেন।
সম্পত্তির লোভে মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে- এই ঘটনা তার নির্মম উত্তর।
বেলাল হোসেন এখন কারাগারে। বিচার সামনে। কিন্তু মীর মজিবুর রহমান খান আর ফিরবেন না।