সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সাইবার স্ক্যামের ফাঁদ: কম্বোডিয়া থেকে ফিরলেন আরও ৫২ জন, মামলা

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৫ জুন ২০২৬ | ১১:২৯ অপরাহ্ন


কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ৫২ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন।

সোমবার দুপুর থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ নিয়ে গত তিন দিনে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে মোট ১৪৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীদের একজন সোমবার বিমানবন্দর থানায় একটি মামলাও করেছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, আগের দুদিনের মতো সোমবার ফেরত আসা সবাইকে বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটির সহায়তায় জরুরি সেবা ও বাড়ি ফেরার জন্য অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র দিয়ে তাদের সবাইকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্রের মাধ্যমে তাদের অর্থের বিনিময়ে চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে হস্তান্তর করা হয়।

সোমবার ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের একজন জানান, শারীরিক নির্যাতন করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হতো। কাজ করতে না চাইলে তাদের টর্চার সেলে নিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে অভিযান চালালে চীনারা পালিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে তারা মুক্তি পান।

আরেকজন ভুক্তভোগী জানান, সেদেশে থাকা বাংলাদেশি দালাল আব্দুল আল মামুন অপু সেখানে বিয়ে করে দীর্ঘ সময় ধরে কম্বোডিয়াতে বসবাস করছেন। কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে তিনি একাই কয়েক হাজার বাংলাদেশিকে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করেছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

এর আগে গত ১২ জুন কম্বোডিয়া থেকে ৩৭ জন এবং ১৩ জুন ৫৪ জন ভুক্তভোগী দেশে ফেরত আসেন। একইভাবে এ বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরেন। মিয়ানমারেও তাদের ভালো কাজের কথা বলে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়েছিল।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিন দিনে ১৪৩ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে বিপুলসংখ্যক মানুষ এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মঙ্গলবারও আরেক দলের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

শরিফুল হাসান আরও জানান, সাইবার স্ক্যাম মানব পাচারের ভয়াবহ একটি ধরন। ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী মানব পাচার ও অভিবাসন চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। কোন প্রক্রিয়ায় তাদের কম্বোডিয়া পাঠানো হয়েছে, সেই চক্রকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুষ্ঠু তদন্ত করা জরুরি।

ব্র্যাক জানিয়েছে, কম্পিউটার বা কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়। এরপর সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ কারণে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ব্র্যাক।