
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমন লাউঞ্জে মঙ্গলবার (১৬ জুন) দিবাগত রাতটা ছিল অন্যরকম। থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট থেকে একে একে বেরিয়ে আসছিলেন ৭৮ জন বাংলাদেশি। কারও হাতে নেই লাগেজ, কারও চোখে অনিশ্চয়তা, কারও মুখে স্বস্তির নিঃশ্বাস। বিদেশে স্বপ্নের চাকরির খোঁজে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ফিরে এলেন নির্যাতন, প্রতারণা আর বন্দিদশার গল্প নিয়ে।
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া এই ৭৮ জনকে নিয়ে গত চার দিনে দেশে ফিরলেন মোট ২২১ জন বাংলাদেশি।
বিমানবন্দরে আগের দিনের মতো এবারও তাদের জরুরি সহায়তা ও বাড়ি ফেরার জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেয় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির সহযোগিতায় এই সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
চাকরির স্বপ্ন, বন্দিদশার বাস্তবতা
ফেরত আসা অনেকের গল্প প্রায় একই।
দেশে বসে তাদের দেখানো হয়েছিল আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির স্বপ্ন। বলা হয়েছিল কম্পিউটার অপারেটর, কলসেন্টার কর্মী কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চাকরি হবে। সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করে কেউ পাঁচ লাখ, কেউ ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে কম্বোডিয়ায় পাড়ি জমান।
কিন্তু সেখানে গিয়ে বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী জানান, তাকে সরাসরি কোম্পানির চাকরির আশ্বাস দিয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন, কোনো চাকরিই নেই। বরং স্থানীয় দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা তাকে টাকার বিনিময়ে একটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়।
তিনি বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম অফিসে কাজ করব। পরে বুঝলাম আমাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।”
‘কাজ না করলে টর্চার সেলে’
আরেকজন ভুক্তভোগীর ভাষায়, স্ক্যাম সেন্টারগুলো ছিল আধুনিক দাসশিবিরের মতো।
তাদেরকে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হতো। নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে শারীরিক নির্যাতন, মারধর, এমনকি বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হতো।
“কাজ করতে না চাইলে টর্চার সেলে নিয়ে যেত। অনেককে বেধড়ক মারধর করা হতো,” বলেন তিনি।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে অভিযান চালালে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা চীনা নাগরিকরা পালিয়ে যায়। এরপরই মুক্তি পান অনেক বাংলাদেশি।
‘এটি মানবপাচারের নতুন রূপ’
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের ভয়াবহ এক রূপ।
তার ভাষায়, “ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে গিয়ে মানুষকে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।”
তিনি বলেন, গত চার দিনে ২২১ জন বাংলাদেশির দেশে ফেরা প্রমাণ করে সমস্যাটি কতটা বড় আকার ধারণ করেছে।
ফেরত আসা কয়েকজন ইতোমধ্যে মামলা করেছেন বলেও জানান তিনি। পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত দালাল ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
দেড় বছরে কম্বোডিয়া গেছেন প্রায় ১৬ হাজার কর্মী
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে চাকরির উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি।
ফেরত আসা ব্যক্তিদের অনেকে দাবি করেছেন, তাদের মতো আরও হাজার হাজার বাংলাদেশি সেখানে আটকে আছেন। অনেকেই চাকরি পাননি, আবার কেউ কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এ তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে—বিদেশে পাঠানোর নামে ঠিক কতজন বাংলাদেশি সাইবার স্ক্যাম চক্রের ফাঁদে পড়েছেন?
মিয়ানমার থেকে কম্বোডিয়া: একই প্রতারণার ছক
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফেরেন আরও ১৮ জন।
তাদের বর্ণনাও ছিল প্রায় একই। ভালো চাকরির প্রলোভন, সীমান্ত পেরিয়ে পাচার, পাসপোর্ট জব্দ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং পরে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা।
সতর্কবার্তা
ব্র্যাক জানিয়েছে, বর্তমানে ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে। এসব প্রলোভনের আড়ালেই সক্রিয় রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও সাইবার অপরাধ চক্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই চাকরির বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডের অন্ধকার জগৎ।
আর সেই অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরছেন একের পর এক বাংলাদেশি—হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, নির্যাতনের স্মৃতি আর নতুন জীবনের আশা নিয়ে।