
২০২৪ সালের নভেম্বর। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দিলেন একজন নতুন কর্মকর্তা— ডা. মোহাম্মদ ইকবাল। সেদিন কেউ জানতেন না, আগামী মাসগুলোতে এই হাসপাতালের চেহারাটাই বদলে যাবে।
বুধবার (১৭ জুন) সকালে তিনি বিদায় নিলেন। কিন্তু যেতে যেতে রেখে গেলেন এমন কিছু পরিবর্তন, যা সহজে মুছে যাবে না।
যন্ত্রের ভাষায় আধুনিকতা
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ একসময় ছিল সীমিত সুবিধার। ডা. ইকবালের সময়ে সেখানে যুক্ত হলো সেল কাউন্টার আর হরমোন অ্যানালাইজার মেশিন। বিভাগটি হয়ে উঠল স্বয়ংসম্পূর্ণ। বসল ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন। প্যাথলজি কক্ষ স্থানান্তরিত হলো এসি লাগানো নতুন জায়গায়।
ডেন্টাল ইউনিটে এলো নতুন চেয়ার। লেবার রুমে স্থাপিত হলো অত্যাধুনিক ডেলিভারি টেবিল— যেখানে একজন মায়ের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি একটু সহজ হয়ে উঠল। সভাকক্ষে যুক্ত হলো এসি ও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম।
একটি হাসপাতালের শরীরী পরিবর্তন
পানির সংকট মেটাতে খনন হলো পুকুর। বসল গভীর নলকূপ আর ওয়াটার পিউরিফায়ার। ভাঙাচোরা সিলিং আর ছাদ মেরামত হলো। জানালায় বসল থাই গ্লাস। টয়লেট সংস্কার হলো।
নারীদের নামাজের জন্য তৈরি হলো ওজুখানাসহ মসজিদ। পুরোনো মসজিদের দেয়ালও মেরামত হলো। হাসপাতাল চত্বরে লাগানো হলো গাছ। বসল গার্ডেন লাইট।
একটি হাসপাতাল চত্বর যে শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়, মানুষের প্রশান্তির জায়গাও হতে পারে— এই বিশ্বাসটাই যেন বাস্তব রূপ নিল।
অপেক্ষার আসনে স্বস্তি, শিশুর জন্য বিশেষ ভালোবাসা
বহির্বিভাগ, বারান্দা ও রিসেপশনে আগে রোগীরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। এখন বসার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার। সিলিং ফ্যান লাগল। শিশু ওয়ার্ড পেল নতুন রূপ। মায়েদের জন্য তৈরি হলো মাতৃদুগ্ধ কর্নার— নবজাতকের প্রথম খাবারটুকু যেন নিরাপদ পরিবেশে পায় মা-শিশু।
বিদ্যুৎ যখন জীবনের প্রশ্ন
হাসপাতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। অন্তঃবিভাগের জন্য বসল দুটি আইপিএস, জরুরি বিভাগের জন্য একটি। অনুমোদন পেল ৩০ কেভির জেনারেটর। অপারেশন টেবিলে, লেবার রুমে, জরুরি বিভাগে— বিদ্যুৎ আর থমকে দাঁড়াবে না।
আট হাজার আহত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর গল্প
বন্ধ হয়ে থাকা ট্রমা সেন্টার পুনরায় চালু হলো ডা. ইকবালের উদ্যোগে। তারপর থেকে প্রায় আট হাজারের বেশি আহত রোগী এখানে পেয়েছেন বিনামূল্যে চিকিৎসা।
স্থাপিত হলো ব্লাড ব্যাংক। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য চালু হলো বিনামূল্যে রক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা— যে রোগীরা প্রতি মাসে রক্তের জন্য দুশ্চিন্তায় থাকতেন, তাদের জন্য এটি ছিল এক বিশাল স্বস্তি।
যেখানে মানবিকতা ছুঁয়ে গেল প্রশাসনকে
দরিদ্র রোগীদের সহায়তায় গঠিত হলো রোগী কল্যাণ ফান্ড। দেড় বছরে বিতরণ হলো ৩ লক্ষাধিক টাকা। যে রোগীর হাতে চিকিৎসার টাকা নেই, তার জন্য এই ফান্ড হয়ে উঠল ভরসার জায়গা।
অন্তঃবিভাগে নিয়মিত হলো কনসালটেন্ট রাউন্ড। নতুন করে বাড়ল তিনটি কেবিন। নিরাপত্তা ও পরিবেশ উন্নয়নে বসল পর্যাপ্ত লাইট।
মানুষ যা বলছে
স্থানীয় বাসিন্দা ও সেবাগ্রহীতারা বলছেন, ডা. মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে হাসপাতালের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও সেবামুখী হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।
একটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি বদলাতে যে নেতৃত্ব দরকার, সেটাই যেন দেখা গেল এই দেড় বছরে।
বিদায়ের দিনে কৃতজ্ঞতা
বিদায় নেওয়ার আগে ডা. মোহাম্মদ ইকবাল বললেন, “সরকারের নির্দেশনা ও সহকর্মীদের সহযোগিতায় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। দায়িত্ব পালনের সময় এলাকার মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেয়েছি, এজন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।”
হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে দিলেন ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা স্মারক। কামনা করলেন তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য।
একজন মানুষ চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন একটি বদলে যাওয়া হাসপাতাল, হাজারো রোগীর কৃতজ্ঞতা আর একটি প্রশ্ন— পরের কর্মকর্তা কি এই ধারা অব্যাহত রাখবেন?