সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনযাত্রা নামবে সাড়ে তিন ঘণ্টায়?

পাঁচ ঘণ্টার পথ সাড়ে তিন ঘণ্টায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে নতুন স্বপ্নের নাম কর্ড লাইন
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৯ জুন ২০২৬ | ১২:৪২ অপরাহ্ন


রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় রওনা দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী আবদুল কাদের। সকালে রাজধানীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। ট্রেন ছাড়ল সময়মতো। কিন্তু কুমিল্লা, আখাউড়া, ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ঢাকায় পৌঁছাতে হলো তাকে। বৈঠক শুরু হয়ে গেছে তখন।

“রেলপথে গেলে আরাম আছে, কিন্তু সময়ের নিশ্চয়তা নেই,” বলছিলেন তিনি। “কখনো পাঁচ ঘণ্টা, কখনো ছয় ঘণ্টারও বেশি লাগে। অথচ সড়কপথে অনেক সময় এর চেয়ে দ্রুত পৌঁছানো যায়।”

আবদুল কাদেরের এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও ব্যবসায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে একই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত অর্থনৈতিক করিডর হওয়া সত্ত্বেও রেলপথে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দূরত্ব এখনো প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। অথচ সড়কপথে এই দূরত্ব মাত্র ২৪৮ কিলোমিটার।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথ ছোট করার স্বপ্ন নিয়েই আবার আলোচনায় এসেছে বহুদিনের ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্প। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রকল্পটির ঘোষণা এসেছে নতুন করে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার কমে যাবে, আর যাত্রার সময় নেমে আসবে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টায়।

অর্ধশতাব্দীর পুরোনো স্বপ্ন

ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইনের ধারণা নতুন নয়। রেলওয়ে সূত্র বলছে, ১৯৬৮ সালেই প্রথম এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পটি সামনে এলেও কখনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, কখনো অর্থায়ন, আবার কখনো নীতিগত অগ্রাধিকারের অভাবে তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, ঢাকা-কুমিল্লা অংশে কর্ড লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তিনটি সম্ভাব্য পথরেখার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পর্যন্ত একটি রুট প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের ভাষায়, এই রুট বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার কমবে এবং যাত্রার সময় প্রায় দুই ঘণ্টা সাশ্রয় হবে।

কেন এত দীর্ঘ পথ?

বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনগুলোকে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, ভৈরব ও নরসিংদী হয়ে ঘুরপথে চলতে হয়। ফলে রেলপথের দূরত্ব সড়কপথের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়।

চার লেন মহাসড়ক চালুর পর অনেক ক্ষেত্রে বাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম যেতে যে সময় লাগে, ট্রেনে তার চেয়েও বেশি সময় লাগে। ফলে আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও রেল তার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার একটি বড় অংশ হারিয়েছে।

কর্ড লাইন নির্মিত হলে আখাউড়া-ভৈরবের দীর্ঘ ঘুরপথ এড়িয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা হয়ে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। এতে শুধু সময় নয়, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়ও কমবে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে।

শুধু যাত্রী নয়, অর্থনীতিরও রেলপথ

কর্ড লাইনকে শুধু যাত্রী পরিবহনের প্রকল্প হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নির্মাণাধীন বে-টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। আগামী দশকে এসব অবকাঠামো চালু হলে পণ্য পরিবহনের চাপ বহুগুণ বাড়বে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রেন পৌঁছাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ইঞ্জিন সংকট ও ট্রেনের স্বল্পতায় সময় আরও বাড়ে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই ধীরগতির কারণে সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কমানো যাচ্ছে না।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পণ্য পরিবহন থেকে আয় হয়েছিল ৭২ কোটি টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে পণ্যবাহী ট্রেন ও ওয়াগনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, কর্ড লাইন চালু হলে একই সময়ে আরও বেশি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে যাত্রী ও পণ্য—দুই ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়বে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল বহু বছর ধরে এই প্রকল্পের দাবি জানিয়ে আসছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক মনে করেন, কর্ড লাইন বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর, বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেলসংযোগ গড়ে উঠবে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, কর্ড লাইন চালু হলে একজন যাত্রী বাসা থেকে বিমানবন্দর যাওয়া, চেক-ইন ও ফ্লাইটের পুরো সময় হিসাব করলে অনেক ক্ষেত্রে বিমানের চেয়েও দ্রুত চট্টগ্রাম পৌঁছাতে পারবেন।

সামনে কী?

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা, পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং অন্যান্য কারিগরি সমীক্ষার কাজ এগিয়ে চলছে। লক্ষ্য হচ্ছে আগামী বছরের মধ্যে ডিপিপি চূড়ান্ত করা এবং ২০২৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে কর্ড লাইন চালু হতে পারে।

তবে এখনো প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়, অর্থায়নের উৎস কিংবা চূড়ান্ত বাস্তবায়ন সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবে কত দ্রুত এগোবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

অপেক্ষায় যাত্রীরা

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান প্রায়ই ট্রেনে ঢাকা যাতায়াত করেন। দীর্ঘ যাত্রা, মাঝেমধ্যে বিলম্ব- সবকিছু সত্ত্বেও তার পছন্দ রেল।

তিনি বলেন, “যদি সত্যিই সাড়ে তিন ঘণ্টায় ঢাকা যাওয়া যায়, তাহলে ট্রেনই হবে সবার প্রথম পছন্দ।”

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কাগজে-কলমে ঘুরে বেড়ানো কর্ড লাইন প্রকল্প এখন নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। সেই আলো কত দূর পৌঁছাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আবদুল কাদের, নুসরাত জাহান কিংবা প্রতিদিনের হাজারো যাত্রীর জন্য এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়- এটি সময় বাঁচানোর, ভোগান্তি কমানোর এবং আরও দ্রুতগতির বাংলাদেশের একটি প্রতিশ্রুতি।