সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কুনিয়ার ‘হ্যাং টেন’-এ ব্রাজিলের ঢেউ পেরোনো রাত

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২০ জুন ২০২৬ | ১০:০০ পূর্বাহ্ন


সার্ফিংয়ে একটি কসরত আছে—‘হ্যাং টেন’।

সাগরের ঢেউয়ের ওপর ভেসে চলা বোর্ডের একেবারে মাথায় উঠে দাঁড়াতে হয়। তারপর পায়ের দশটি আঙুল একসঙ্গে বোর্ডের বাইরে ঝুলিয়ে দিতে হয়। কাজটি দেখতে যত সহজ, করতে তত কঠিন। দরকার নিখুঁত ভারসাম্য, সঠিক সময়জ্ঞান আর দুর্দান্ত ফুটওয়ার্ক।

ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের রাতটিও যেন ছিল তেমনই এক ‘হ্যাং টেন’। প্রত্যাশার সাগর উত্তাল, সমালোচনার ঢেউ খাড়া, আর ব্রাজিলকে সেই ঢেউয়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো ভারসাম্য হারানো ছাড়াই।

মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১–১ ড্র করার পর ব্রাজিলকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ ছিল না। দলে নিখাদ ৯ নম্বর নেই—গোল করবেন কে? মাঝমাঠে ধার নেই—খেলা বানাবেন কে? ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা হাইতির বিপক্ষেও ব্রাজিল চাপ অনুভব করবে কি না, সেই আলোচনাও কম হয়নি।

মাঠে নেমে ব্রাজিল উত্তর দিল বলের ভাষায়। আর সেই উত্তরের কেন্দ্রে ছিলেন মাতেউস কুনিয়া—যেন ৯ নম্বর জার্সি পরে নামা এক সার্ফার। প্রত্যাশার চাপের ঢেউ তিনি সামলালেন পায়ের কাজে, গোলের গন্ধে, আর উদ্‌যাপনে। ৩৬ মিনিটের মধ্যে জোড়া গোলের পর তাঁর ‘হ্যাং টেন’ উদ্‌যাপন যেন জানিয়ে দিল, ব্রাজিলের আক্রমণভাগ এখন আর স্রোতে ভাসছে না; বরং ঢেউয়ের ওপর দাঁড়াতে শিখছে।

হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল জিতেছে ৩–০ গোলে। স্কোরলাইন পরিষ্কার, জয় স্বস্তির। তবে পুরো ম্যাচ দেখলে ব্রাজিল সমর্থকদের মনে সামান্য আক্ষেপ থাকতেই পারে। দুটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়েছে—১২ মিনিটে রাফিনিয়ার, ৭৮ মিনিটে বদলি নামা এনদ্রিকের। আরও অন্তত তিনটি ভালো সুযোগ নষ্ট করেছে কার্লো আনচেলত্তির দল। সব গোলই এসেছে প্রথমার্ধে। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, বিরতির পর ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ধার কোথায় হারাল?

তবু এই জয় শুধু তিন পয়েন্টের ছিল না। এটি ছিল একটি বার্তা—আনচেলত্তির আক্রমণভাগ ছন্দে এলে প্রতিপক্ষের ভয় পাওয়ার কারণ আছে।

মরক্কোর বিপক্ষে যে জাগরণ দেখা যায়নি, হাইতির বিপক্ষে সেটিই শুরু হলো কুনিয়াকে একাদশে এনে। আনচেলত্তি আবারও পরিবর্তন করলেন দল, আর সেই পরিবর্তনেই যেন মিলে গেল ব্রাজিলের গোল-ধাঁধার শেষ সূত্র। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারাইস ও লুকাস পাকেতা প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। প্রথম ১০ মিনিটে ব্রাজিল একটু অগোছালো ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে বলের সরবরাহ বাড়তেই ভিনিসিয়ুস, রাফিনিয়া ও কুনিয়া খুলে ধরেন আক্রমণের পেখম।

২৩ থেকে ৩৬—মাত্র ১৪ মিনিট। এই সময়ের মধ্যেই ম্যাচের ভাগ্য প্রায় লিখে ফেলেন কুনিয়া।

প্রথম গোলের পেছনে ছিলেন ভিনিসিয়ুস। তাঁর শট ঠেকিয়ে দেন হাইতির গোলকিপার জনি প্লাসিড, কিন্তু ফিরতি বল পেয়ে ভুল করেননি কুনিয়া। দ্বিতীয় গোলটি আরও সুন্দর। ভিনিসিয়ুসের দুর্দান্ত থ্রু পাস, কুনিয়ার নিখুঁত ফিনিশ। দুই গোলের পর দুইবারই সেই ‘হ্যাং টেন’ উদ্‌যাপন—যেন তিনি শুধু গোল করেননি, ব্রাজিলকে সমালোচনার ঢেউ থেকে তুলে এনেছেন।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এবার গোল করলেন ভিনিসিয়ুস নিজেই। পাকেতার পাস থেকে তাঁর ফিনিশ ছিল একেবারে নিখাদ ৯ নম্বরের মতো—গোলকিপারের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে। ম্যাচজুড়ে ভিনিসিয়ুস দেখিয়েছেন, শুধু উইং দিয়ে দৌড়ানো নয়, আক্রমণ সাজানোতেও তিনি ব্রাজিলের বড় ভরসা হতে পারেন।

তবে ব্রাজিলের আনন্দে প্রথমার্ধেই একটি দুশ্চিন্তা যোগ হয়। ৪০ মিনিটে চোট পেয়ে উঠে যান রাফিনিয়া। তাঁর বদলে নামেন ১৯ বছর ৩২০ দিন বয়সী ফরোয়ার্ড রায়ান। বিরতির সময় স্কোর ৩–০। ম্যাচ তখন প্রায় ব্রাজিলের হাতে।

দ্বিতীয়ার্ধে আনচেলত্তি সম্ভবত আক্রমণভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ নেন। ৬৪ মিনিটে কুনিয়াকে তুলে নামান এনদ্রিককে। তখন মাঠে ব্রাজিলের চার ফরোয়ার্ড—এনদ্রিক, রায়ান, ভিনিসিয়ুস ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। নামের ভারে আক্রমণভাগ ঝলমলে হলেও খেলায় সেই ধার আর দেখা যায়নি। বরং কয়েকবার ব্রাজিলের বক্সে ঢুকে হাইতি উল্টো ভয় ধরিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধে ভালো একটি সেভ করতে হয় আলিসনকে। ব্রাজিলের পোস্টে হাইতির তিনটি শট সেটিই বলছে।

হাইতির বিপক্ষে অতীত রেকর্ডে ব্রাজিলের দাপট ছিল স্পষ্ট। আগের তিন সাক্ষাতে ব্রাজিলের কাছে ১৭ গোল হজম করেছিল তারা। কিন্তু এই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে হাইতি দেখিয়েছে, শুধু রক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, সুযোগ পেলে তারা আঘাত করতেও পারে।

ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারিও ছিল ব্রাজিলের পক্ষে। ৬৭ হাজার আসনের স্টেডিয়ামে হাইতির চেয়ে ব্রাজিল সমর্থকের সংখ্যা ছিল বেশি। গ্যালারিতে ছিলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি কাকা ও রোনালদো নাজারিও। নতুন করে যোগ হয়েছিলেন রোনালদিনিও। মাঠে নামার আগে ভিনিসিয়ুস ‘গাউচো’র সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। হয়তো সেই অনুপ্রেরণাই প্রথমার্ধে তাঁকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল। হাইতির রক্ষণকে তিনি কখনো পাসে, কখনো গতিতে, কখনো সিদ্ধান্তে ছিন্নভিন্ন করেছেন।

তবু ব্রাজিলের রাতের আসল ছবি একটাই—কুনিয়ার ‘হ্যাং টেন’।

প্রথম ম্যাচের ড্রয়ের পর যে ব্রাজিলকে অনিশ্চয়তার সাগরে ভাসতে দেখা যাচ্ছিল, সেই দলই হাইতির বিপক্ষে ঢেউয়ের মাথায় দাঁড়াল। পুরোটা নিখুঁত ছিল না, দ্বিতীয়ার্ধে প্রশ্ন আছে, সুযোগ নষ্টের হিসাব আছে। কিন্তু গোলের সামনে ব্রাজিলের যে নতুন ভরসা দরকার ছিল, কুনিয়া অন্তত এক রাতের জন্য সেই উত্তর দিয়েছেন।

দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে উঠেছে ব্রাজিল। সমান ম্যাচে সমান পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে মরক্কো, গোল ব্যবধানে পিছিয়ে। ২ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্কটল্যান্ড। আর দুই ম্যাচেই হেরে তলানিতে হাইতি।

বিশ্বকাপের পথ এখনো লম্বা। সামনে ঢেউ আরও বড় হবে, প্রতিপক্ষ আরও কঠিন। কিন্তু ফিলাডেলফিয়ার এই রাতে ব্রাজিল অন্তত বুঝিয়ে দিল—তার আক্রমণভাগ ঘুমিয়ে নেই। আর সেই আক্রমণের বোর্ডের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন এক ‘সার্ফার’, যার নাম মাতেউস কুনিয়া।