সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

গোপনীয়তার দেওয়াল যখন ভাঙছে অন্যরা, অন্ধকারে রয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২২ জুন ২০২৬ | ৯:৪৩ পূর্বাহ্ন


একটি কাল্পনিক দৃশ্যকল্প দিয়ে শুরু করা যাক

ধরা যাক, দিল্লি আর ঢাকার দুই ব্যবসায়ী একই বছরে একই পরিমাণ অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন। কয়েক বছর পর দিল্লির ব্যবসায়ীর কাছে হঠাৎ চিঠি আসে কর বিভাগ থেকে- তার সুইস অ্যাকাউন্টের হিসাব এখন ভারত সরকারের হাতে, কারণ ভারত ওইসিডির স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় কাঠামোর অংশ। ভয় আর ঝুঁকি বিবেচনায় তিনি একসময় অর্থ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু ঢাকার ব্যবসায়ীর গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন- তার নামে কোনো চিঠি আসে না, কোনো জিজ্ঞাসাবাদ হয় না, কারণ বাংলাদেশ এখনো এই তথ্য বিনিময়ের বাইরে। ফলাফল? তিনি স্বস্তিতে আরও টাকা পাঠাতে থাকেন, এমনকি আরও সাহস করে।

এই কাল্পনিক দৃশ্যটিই বাস্তবে ঘটে চলেছে সংখ্যার আকারে। সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ভারত-পাকিস্তানের মতো যেসব দেশ সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের আওতায় আছে, তাদের আমানত প্রতি বছর কমছে। আর যে বাংলাদেশ এখনো এই কাঠামোর বাইরে, সেখানে আমানত বছর বছর বেড়েই চলেছে- মাত্র এক বছরেই ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায়।

যে দরজা বন্ধ, তা দিয়েই ঢুকছে পাচারের টাকা

বিশ্বের শতাধিক দেশ এখন সুইস ব্যাংকের সেই চিরচেনা গোপনীয়তার দেওয়াল ভেঙে নিজ নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করছে- আর তা দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করছে অর্থ পাচার, করফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জন। মূলত দুটি পথে এই তথ্য পাওয়া যায়। কিছু দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, সরাসরি সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে। আবার যাদের এমন চুক্তি নেই, তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ওইসিডির মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্য নিচ্ছে। এই দুই প্রক্রিয়ায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ সুইস ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করেছে প্রায় ৩৬ লাখ তথ্য। কিন্তু এই দুটি পথের কোনোটিতেই নাম নেই বাংলাদেশের।

বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুনের ভাষ্যে উঠে এসেছে এই বাস্তবতার মূল কারণ, “সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই, এবং আয়কর-সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করা সংস্থা ওইসিডির সদস্যও নয় বাংলাদেশ। যে দেশগুলো এই সংস্থার সদস্য, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সুইস ব্যাংকের তথ্য পেয়ে যায়। বাংলাদেশ এই সদস্যপদ কেন এখনো পায়নি বা মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর।”

ওইসিডি: যে ক্লাবের বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

১৯৬২ সালে প্যারিসে সদর দপ্তর নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ওইসিডি মূলত উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর একটি নীতি-নির্ধারণী আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর ৩৮টি সদস্য দেশ সুইস ব্যাংক থেকে সহজেই তথ্য পেয়ে যায়। এর বাইরেও আরও ৬৩টি দেশ ওইসিডির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড- কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস) ও অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এইওআই)- অনুসরণ করে তথ্য সংগ্রহ করে। এই দুই কাঠামো মিলিয়ে ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০১টি দেশ সুইস ব্যাংক থেকে নিয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ তথ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের পথটা আবার আলাদা। তারা নিজস্ব আইন ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্টের (এফএটিসিএ) আওতায় ২০১৪ সাল থেকেই সুইস ব্যাংকে রাখা মার্কিন নাগরিকদের অর্থের তথ্য নিচ্ছে, এবং ২০২৪ সালে দুই দেশ সরকার পর্যায়ে নতুন তথ্য বিনিময় চুক্তিও করেছে। এই তালিকায় যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং থেকে শুরু করে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়ার নামও রয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই।

একটা সময় সুইস ব্যাংকের তথ্য ছিল প্রায় ভেদ্য-অভেদ্য এক রহস্য। কিন্তু ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর কর ফাঁকি ও কালোটাকা রোধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায় ওইসিডি, আর তার ফলেই জন্ম নেয় সিআরএস কাঠামো। বাংলাদেশ এখনো এই কাঠামোর বাইরে। তবে আশার কথা, জুলাই জাতীয় সনদের ৭৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে; দেশে-বিদেশে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করবে এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেবে। জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলই এই প্রস্তাবে একমত হয়েছে।

সংখ্যাই বলে দিচ্ছে গল্পটা

পরিসংখ্যান ঘাঁটলেই স্পষ্ট হয়ে যায়, তথ্য বিনিময়ের আওতায় থাকা দেশগুলোর সুইস আমানত কীভাবে বছরের পর বছর কমছে, আর বাংলাদেশ কীভাবে এর ব্যতিক্রম। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের আমানত ছিল ৩৭ হাজার ৫২০ কোটি ফ্র্যাংক, যা ২০২২ সালেই কমে নেমে আসে ১৯ হাজার ৯৪৩ কোটিতে; এরপর কিছুটা ওঠানামা করে ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৯০ কোটি ফ্র্যাংকে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও একই ধারাবাহিক পতন- ২০২১ সালের ৭০ কোটি ফ্র্যাংক থেকে ক্রমান্বয়ে কমে ২০২৫ সালে নেমেছে মাত্র ২৩ কোটিতে। ভারতের আমানতও ২০২৪ সালের ৩৫০ কোটি ফ্র্যাংক থেকে কমে ২০২৫ সালে হয়েছে ৩২৩ কোটি ফ্র্যাংক।

পুরো সুইজারল্যান্ডের চিত্রটাও একই দিকে- ২০২১ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৭ কোটি ফ্র্যাংক, যা ধাপে ধাপে কমে ২০২২ সালে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৯ কোটি, ২০২৩ সালে ৯৮ হাজার ৩৪৫ কোটি, ২০২৪ সালে ৯৭ হাজার ৭১২ কোটি এবং সবশেষ ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৮৯ হাজার ৬৩৮ কোটি ফ্র্যাংকে।

আর এই সামগ্রিক পতনের মাঝেই বাংলাদেশের আমানত একলাফে বেড়েছে ৪১ শতাংশ, পৌঁছে গেছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংকে দক্ষিণ এশিয়ায় যা ভারতের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সংখ্যাটা যতই বড় হোক, এর পেছনের বার্তাটা আরও বড় যে দেশ নজরদারির বাইরে থাকে, সেই দেশই হয়ে ওঠে পাচারকারীদের সবচেয়ে পছন্দের ঠিকানা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের সুইস ব্যাংক-নির্ভর পাচারের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে, তখন বাংলাদেশের এই কাঠামোর বাইরে থাকাটা নিঃসন্দেহে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবে রূপ পায় এবং বাংলাদেশ অবশেষে কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডে যুক্ত হতে পারে, তবেই হয়তো সেই কাল্পনিক ঢাকার ব্যবসায়ীর গল্পটাও বদলে যাবে- একদিন তার কাছেও আসবে সেই চিঠি, যেদিন গোপনীয়তার শেষ দেওয়ালটাও ভেঙে পড়বে।