সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

যে অদক্ষতাই বনে গেছে আয়ের সোনার খনি: চট্টগ্রাম বন্দরের এক অস্বস্তিকর সত্য

কনটেইনার যত বেশি দিন বন্দরে পড়ে থাকে, আয়ও তত বাড়ে—বিশ্বে যা লজ্জার, চট্টগ্রামে তা-ই মুনাফার সূত্র
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৪ জুন ২০২৬ | ১০:২৬ পূর্বাহ্ন


বিশ্বের যেকোনো আধুনিক বন্দরের কাছে একটাই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ- জাহাজ থেকে নামার পর একটা কনটেইনার কত দ্রুত বন্দর ছেড়ে যেতে পারছে? যত দ্রুত, তত দক্ষ বন্দর। এই সূচকেই বিশ্বের সেরা বন্দরগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের খাতা খুলতেই দেখা যায় একটা উল্টো বাস্তবতা। যে জিনিসটা সারা বিশ্বে অদক্ষতার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়, সেটাই হয়ে উঠেছে এই বন্দরের আয়ের অন্যতম বড় উৎস।

যখন দেরিই হয়ে যায় আয়ের উৎস

নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের গড় আয় এখন ১৫২ ডলার। এই আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসছে স্টোর রেন্ট থেকে- মানে কনটেইনার যত বেশি দিন বন্দরে পড়ে থাকে, তার বিপরীতে আদায় করা মাশুল থেকে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল- এই পাঁচ মাসের হিসাব বলছে, প্রতি টিইইউতে স্টোর রেন্ট থেকে গড়ে আয় হয়েছে ৩৪ দশমিক ২৫ ডলার, যা বন্দরের মোট পরিচালন রাজস্বের ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। এটি বন্দরের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজস্ব উৎস। সবচেয়ে বড় উৎস স্বাভাবিকভাবেই কনটেইনার লোডিং-ডিসচার্জিং কার্যক্রম, যেখান থেকে প্রতি টিইইউতে আয় হয়েছে ৭১ দশমিক ৬৮ ডলার- মোট রাজস্বের ৪৭ শতাংশ। এর বাইরে কিউজিসি (কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন) চার্জ থেকে এসেছে ১৭ দশমিক ৯১ ডলার (১২ শতাংশ), লিফট অন-অফ থেকে ৯ দশমিক ৪৩ ডলার (৬ দশমিক ২০ শতাংশ), আর বাকিটা এক্সট্রা মুভমেন্ট, ওয়ার্ফ রেন্ট, হোস্টিং চার্জ, স্টাফিং-আনস্টাফিং থেকে।

সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় গল্পটা- কনটেইনার যত বেশি সময় বন্দরে আটকে থাকছে, বন্দরের পকেটে তত বেশি টাকা ঢুকছে। আর এই অস্বস্তিকর সত্যটাই সামনে নিয়ে এসেছে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।

“এটা গ্রহণযোগ্য নয়”- সাবেক পর্ষদ সদস্যের প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, স্টোর রেন্ট থেকে বেশি আয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; এটি বন্দর ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতার প্রতিফলন, আর এটাকে অপারেটিং আয়ে অন্তর্ভুক্ত করাটাও যুক্তিযুক্ত নয়। তাঁর প্রশ্ন- বন্দরের অভ্যন্তরে কেন ৩০-৪০ হাজার কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার, এবং এর পেছনে কাস্টমস, আমদানিকারক ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দায় কতটুকু, তা চিহ্নিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিক নিয়মে একটা কনটেইনার বন্দরে পৌঁছার তিনদিনের মধ্যে খালাস হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে গড়ে এক সপ্তাহের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিলম্ব যেমন এর কারণ, তেমনি কম খরচে সংরক্ষণের সুযোগ থাকায় কিছু আমদানিকারকও দ্রুত খালাসে আগ্রহী হন না। জেটি পেতে এখন আর অপেক্ষা করতে হয় না বলে প্রশ্ন থেকে যায়- তাহলে কনটেইনার এত দিন ইয়ার্ডে কেন পড়ে থাকে?

সাড়ে নয় দিনের অপেক্ষা

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর পর পণ্য খালাস সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময়- যাকে বলা হয় ডুয়াল টাইম- তা বন্দরের সক্ষমতা পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নৌ-পরিবহন মন্ত্রীকে দেওয়া একটি প্রেজেন্টেশনে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিটি কনটেইনারের গড় অবস্থানকাল বর্তমানে সাড়ে নয় দিন, এবং এর বড় অংশ ব্যয় হয় কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সেই। কাস্টমস প্রি-অ্যাসেসমেন্ট বা গ্রিন চ্যানেলের মতো ব্যবস্থা এখনো সীমিত। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ঠিকঠাক থাকলে বন্দর গড়ে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই কনটেইনার ডেলিভারির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সক্ষম।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল রাখার স্বার্থে প্রতি মাসে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে কনটেইনার বের করা গেলে ইয়ার্ডে জায়গা খালি থাকবে, ফলে অপারেশনাল কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। তিনি জানান, অনেক সময় আমদানিকারকরাও সুবিধার জন্য পণ্য বন্দরে রেখে দেন; এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি নিশ্চিত করতে বন্দরের পক্ষ থেকে স্টোর রেন্ট বাড়িয়েও দেওয়া হয়, যাতে আর্থিক চাপে হলেও আমদানিকারকরা সময়মতো পণ্য ছাড়িয়ে নেন।

জার্মান পরামর্শকের সতর্কবার্তা

চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিং। তাদের বিশ্লেষণ স্পষ্ট জানায়, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কনটেইনারের অবস্থানকাল কমিয়ে আনা। মাস্টারপ্ল্যানে বন্দরের বার্ষিক পরিচালন সক্ষমতা ধরা হয়েছিল ২৭ লাখ টিইইউ, যা পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল যুক্ত হওয়ার পর বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১ লাখ ৫০ হাজার টিইইউতে। কিন্তু বাস্তবে বন্দর এরই মধ্যে বছরে ৩৪ লাখ টিইইউর বেশি হ্যান্ডলিং করছে—হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিংয়ের ভাষায়, যা মূলত বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে অর্জিত হচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে যা টেকসই নয়।

বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পণ্য খালাসে সময়ক্ষেপণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বহু বেশি। কাস্টমস, পরীক্ষাগার, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক- সবার সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে এই খালাস প্রক্রিয়া। বড় বা বিদেশী অপারেটর নিয়োগের দাবি যতটা আলোচিত হয়, কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিলম্ব নিয়ে আলোচনা তার তুলনায় কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাস্টমসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পুরো প্রক্রিয়ার বিলম্বের দায় কেবল কাস্টমসের নয়; একটি কনটেইনার খালাসে মোট সময়ের মধ্যে কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতায় গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ সময় ব্যয় হয়, বাকি সময় চলে যায় অন্য অংশীজনদের কার্যক্রমে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো. আমিরুল হক একটু কড়াভাবেই বলেন, বন্দর দিনের পর দিন কনটেইনার পড়ে থাকার জায়গা নয়। পণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতেই অনেক সময় দিনের পর দিন লেগে যায় আমদানিকারকদের, এ সময় কনটেইনার বন্দরে রয়ে যায়। আমদানি হওয়া কনটেইনারের অর্ধেকেরও বেশি এখনো বন্দর চত্বরেই খুলে পণ্য খালাস করতে হয়—আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় যা খুবই অপ্রচলিত।

রেকর্ড গড়ছে আয়, রেকর্ড গড়ছে হ্যান্ডলিং

এত অদক্ষতার আলোচনার মধ্যেও একটা সত্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে- বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতেও চট্টগ্রাম বন্দরের আয় বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। দুই অর্থবছরের তুলনায় বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়েছে ৪৪ শতাংশেরও বেশি। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বন্দরের আয় ছিল ৪ হাজার ৯৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা পরের বছরের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকায়- ২২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি। ব্যয় কমিয়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, এবং কর প্রদানের পর মোট রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

গত পাঁচ বছরের চিত্রও বলে দেয় ধারাবাহিক উন্নতির গল্প। ২০২৫ সালে আয় ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, ব্যয় ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা- রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির হারও সংযত রাখা হয়েছে- ২০২৫ সালে মাত্র ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা, যার মধ্যে কর হিসেবে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং ভ্যাট হিসেবে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা।

২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস- আগের বছরের ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউএসের তুলনায় ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ বেশি, বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১১ শতাংশ, জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ- ৩ হাজার ৮৫৭ থেকে ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন সময়ে জাহাজের গড় বন্দর-অবস্থানকাল ছিল শূন্য- মানে জেটিতে নোঙর করার জন্য আর অপেক্ষা করতে হয়নি।

নতুন ক্রেন, নতুন গতি

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান রেখেছে কিউ গ্যান্ট্রি ক্রেন প্রযুক্তি। ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বন্দরে ছিল কেবল চারটি ক্রেন। এর পর ধাপে ধাপে যুক্ত হয়েছে আরও ১৮টি- সর্বশেষ চারটি যুক্ত হয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে, যা পরিচালনা করছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল। এখন বন্দরে মোট ২২টি কিউ গ্যান্ট্রি ক্রেন, যেগুলো একযোগে চালালে প্রতি ঘণ্টায় হ্যান্ডলিং করা সম্ভব ৬৬০টি কনটেইনার—যেখানে জাহাজের সাধারণ ক্রেনে ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব।

এই বিনিয়োগের দামও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। ২০১৮ সালে ছয়টি ক্রেন আনতে খরচ হয়েছিল মোট ৩৪৫ কোটি টাকা—প্রতিটির দাম পড়েছিল গড়ে সাড়ে ৫৭ কোটি টাকা। ২০২২ সালে চারটি ক্রেনে খরচ পড়ে প্রতিটিতে ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক চারটি ক্রেনের দাম পড়েছে প্রতিটি ৭৫ কোটি টাকা- ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, বন্দরের রেকর্ড সাফল্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী নেতৃত্ব, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানো, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তিনি জানান, ২০১৮ সালে যেখানে মোট ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬ একক কনটেইনার ওঠানামা করত, ২০২৫ সালে তা ছাড়িয়ে গেছে ৩৪ লাখ। সচিব নাসির উদ্দিন যোগ করেন, ২২টি ক্রেন একসঙ্গে কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৬৬০টি কনটেইনার ওঠানামা সম্ভব—দ্রুত, এবং নিরাপদও।

অপেক্ষার দিন কমে এসেছে অনেকটাই

চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক স্মরণ করিয়ে দেন, এক দশক আগেও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা একটি জাহাজকে পণ্য খালাসের জন্য ১৪ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন তা নেমে এসেছে দুই থেকে তিন দিনে। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েলের ভাষায়, জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমলে ভাড়াও কমবে, ভাড়া কমলে জাহাজ আসার হার বাড়বে, আর তাতে বাড়বে দেশের রাজস্বও—একটা চক্র, যেখানে প্রতিটি অংশ একে অপরকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

দুই ছবি, একই বন্দর

এই হলো চট্টগ্রাম বন্দরের আসল ছবি- একদিকে রেকর্ড আয়, রেকর্ড হ্যান্ডলিং, আধুনিক ক্রেন আর শূন্য অপেক্ষার জাহাজজট নিয়ে এক গর্বের গল্প। আরেকদিকে সেই একই বন্দরের আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসছে এমন একটা সূচক থেকে, যাকে বিশ্ব মানদণ্ডে গণ্য করা হয় ব্যর্থতা হিসেবে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর আর ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার বে-টার্মিনাল প্রকল্প যখন চট্টগ্রাম বন্দরকে একটা আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তখন প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়ে ওঠে- অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সেই পুরোনো জট আর কনটেইনারের দীর্ঘ অপেক্ষা না কমলে, বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা আসলে কতটা প্রকাশ পাবে?

বন্দরের ভবিষ্যৎ যাত্রায় তাই কেবল নতুন ক্রেন বা টার্মিনাল নয়- দরকার সেই অদৃশ্য সময়টাকেও জয় করা, যা প্রতিটি কনটেইনারের সঙ্গে নিঃশব্দে যুক্ত হয়ে থাকে বন্দরের ইয়ার্ডে।