সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কোটি টাকার সেতু, কিন্তু ওঠার পথ নেই

পটিয়া-আনোয়ারার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি এখন যেন ইট-পাথরের এক স্মৃতিচিহ্ন, পার হতে হয় মৃত্যুফাঁদ সাঁকো দিয়ে
রবিউল হোসেন | প্রকাশিতঃ ২৪ জুন ২০২৬ | ৫:৫৩ অপরাহ্ন


দূর থেকে দেখলে মনে হয় সাফল্যের একটা গল্প। ঘোলা পানির খালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে শক্তপোক্ত একটা সেতু, রঙ করা লালচে কংক্রিটের পাটাতন আর মরচে ধরা রেলিং নিয়ে। কিন্তু কাছে গেলেই ভেঙে যায় সেই ছবি। সেতুর দুই প্রান্তেই জন্মে গেছে আগাছা-জঙ্গল, যেন বহু বছর ধরে এখানে মানুষের যত্নের ছোঁয়া পড়েনি।

আর সেতুতে ওঠার মুখে নেমে এলে দেখা যায় আসল দুর্ভোগের ছবি। ভাঙা বাঁশের চটা আর গোলাকার কাঠের গুঁড়ি জোড়াতালি দিয়ে বিছানো একটা অস্থায়ী পথ, যার প্রতিটা বাঁশের ফালি বিকৃত হয়ে উঠে আছে এলোমেলোভাবে। এই পথ দিয়েই এখন প্রাণ হাতে নিয়ে পার হতে হয় মানুষকে।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার আশিয়া ইউনিয়নের বাথুয়া-বিপিন বিহারী নন্দী সড়কের আশিয়া খালের ওপর দাঁড়ানো এই টাঙ্গাপুল সেতুর গল্পটা এমনই- একটা প্রকল্পের সাফল্য আর প্রশাসনিক উদাসীনতার ব্যর্থতা, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার গল্প।

যেখানে দুই উপজেলা মিলত একটা সেতুতে

সেতুর পূর্ব পাড়ে পটিয়া, পশ্চিম পাড়ে আনোয়ারা। দুই উপজেলার এই সংযোগস্থল দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করতেন হাজার হাজার মানুষ- স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রোগী বহনকারী মানুষ, সবাই। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এই সেতুটি নির্মাণ করেছিল ঠিক এই উদ্দেশ্যেই- দুটি উপজেলার মানুষকে কাছে আনতে, যাতায়াতের কষ্ট কমাতে।

কিছু বছর ভালোই চলেছিল। মানুষ নিয়মিত চলাচল করতেন, মালামাল পরিবহন করতেন। তারপর আস্তে আস্তে শুরু হলো ক্ষয়। গত আট বছর ধরে সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক ভেঙে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এখন বিশাল এই সেতুটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কার্যত অকেজো- যেন একটা দ্বীপের মতো, যেখানে পৌঁছানোর কোনো নিরাপদ পথ নেই।

যখন সাঁকোই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা

যানবাহন চলার তো প্রশ্নই ওঠে না, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে পার হওয়াও এখন এক বিপজ্জনক অভিযান। বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে সেতুর প্রবেশমুখে ভাঙা বাঁশের ফালি আর গোলাকার কাঠের গুঁড়ি বিছিয়ে একটা অস্থায়ী চলার পথ বানিয়ে নিয়েছেন। একটা জোড়াতালির সমাধান, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বাঁশের ফালিগুলো এখন এমনভাবে বিকৃত আর বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে যে পা ফেলার আগে দুবার ভাবতে হয়, আর চারপাশে জন্মে ওঠা ঘন আগাছা স্পষ্ট করে দেয়- এই পথটার দিকে কারও নজর পড়েনি বহুদিন।

সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যটা ফুটে ওঠে যখন মুমূর্ষু রোগী বা বয়োবৃদ্ধ মানুষকে এই ভাঙা বাঁশের পথ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার হয়। যেখানে একটা সহজ সংযোগ সড়ক থাকার কথা, সেখানে এখন প্রাণ হাতে নিয়ে এলোমেলো বাঁশের ফালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়- আর বিকল্প খুঁজলে অপেক্ষা করে আরও দীর্ঘ পথ, যেখানে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে মানুষের সময় ও অর্থ, দুটোই।

“আধা কিলোমিটারের পথ আড়াই কিলোমিটার”

পার্শ্ববর্তী জিরি ইউনিয়নের পশু চিকিৎসক মোহাম্মদ সৈয়দের কথায় ফুটে ওঠে এই দুর্ভোগের আসল মাত্রা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাঘুয়া এলাকার এই টাঙ্গাপুল সেতুটি ওই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে আমরা আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসতে পারতাম, সেখানে সেতুটি অকেজো হয়ে যাওয়ায় এখন আড়াই কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে।’ পাঁচগুণ দীর্ঘ একটা পথ- যা প্রতিদিন বহু মানুষের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, শুধু একটা সংযোগ সড়কের অভাবে।

সেতু সংলগ্ন এলাকার দোকানদার মো. আনোয়ার সওদাগরের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘সেতু তৈরি করে রাখা হয়েছে, কিন্তু আমরা উঠতেই পারি না। সেতুর দুই পাড়ে দুই উপজেলা। একসময় এলাকার মানুষ সহজে পারাপার করত। গত আট বছর ধরে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে কোনোমতে চলাচল করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও সঠিক তদারকির অভাবেই সেতুটির আজ এই অবস্থা। সংযোগ সড়ক সংস্কার ও মাটি ভরাট করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব, কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা করা হচ্ছে না।’ তাঁর শেষ কথাটাই যেন সবচেয়ে বেশি কাঁটার মতো বিঁধে- সমাধান এত সহজ, তবুও তা হচ্ছে না কেন?

রাজনীতির মাঝে আটকে যাওয়া একটা অবকাঠামো

স্থানীয়দের ভাষ্যে উঠে আসে এই সেতুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও। সেতুটি নির্মিত হয়েছিল ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। এরপর সেতুটি দুই উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায়—যেন কোনো একক প্রশাসনিক এখতিয়ারে পুরোপুরি না পড়ার কারণেই- অকেজো হয়ে পড়ার পরও দীর্ঘ আট বছরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে স্বস্তির খবর হলো, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেতুটি সংস্কারের একটা উদ্যোগ অবশেষে শুরু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কাগজে এগিয়েছে, বাস্তবে এখনও স্থবির

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সেতুটি সংস্কার ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য দুটি প্রকল্প অনুমোদনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে টেন্ডার আহ্বান করে কাজ শুরু হবে।

আশিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিকাশ বড়ুয়া বলেন, ‘সেতুটির দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ জরুরি। আমরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় উপজেলা প্রশাসন ও প্রকৌশল অফিসকে বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথও কথা দিচ্ছেন, তবে সতর্কতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সেতুটি সংস্কার এবং দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য দুটি প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে। আমরা চেষ্টা করছি যাতে দ্রুত সেতুটির সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা যায়।’

একটা সেতু, একটা প্রতীক্ষা

আট বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুটা শুধু একটা অবকাঠামো নয়, এটা একটা প্রতীক। উন্নয়নের পরিকল্পনা যখন বাস্তবায়নের শেষ ধাপে এসে আটকে যায়, তখন কোটি টাকার বিনিয়োগও কোনো কাজে আসে না। যে সেতু মানুষকে কাছে আনার কথা ছিল, সেই সেতুই এখন দাঁড়িয়ে আছে দূরত্বের প্রতীক হয়ে। আর তার নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া আশিয়া খালের পানির মতোই বয়ে যাচ্ছে মানুষের প্রতিদিনের কষ্ট, অপেক্ষা আর ক্ষোভ।

ফাইল আঞ্চলিক কার্যালয়ে গেছে, প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়। কিন্তু পটিয়া আর আনোয়ারার মধ্যে সেই ভাঙা বাঁশ আর কাঠের গুঁড়ির পথে পা রেখে প্রতিদিন যে মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন, তাঁদের কাছে এই অপেক্ষা মাপা হয় ফাইলের পাতায় নয়, নিজের পায়ের নিচে এলোমেলো বাঁশের সেই অস্থির কাঁপুনিতে।