
চট্টগ্রামের মানুষ ভূমিকম্পের কাঁপুনি নতুন কিছু নয় বলেই মনে করতে পারেন। কারণ মিয়ানমারে কোনো বড় ভূমিকম্প হলেই এর রেশ এসে পড়ে এই শহরেও। এর কারণ লুকিয়ে আছে ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতায়। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাশ দিয়ে একটি ফল্ট লাইন রয়েছে, যার কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট স্বাভাবিকভাবেই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্রে চট্টগ্রাম এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো ভারতীয় প্লেট এবং বার্মিজ মাইক্রোপ্লেটের সংঘর্ষের কারণে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। আর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকার কিছু অংশ- রাঙামাটি ও বান্দরবান দেশের সবচেয়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন-১-এর মধ্যে পড়ে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম শুধু সাক্ষী নয়, বরং সম্ভাব্য কেন্দ্রস্থলও হতে পারে আগামীর কোনো বিপর্যয়ের। আর এমন একটা সতর্কবার্তা, যা শুধু চট্টগ্রামের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই এখন অপেক্ষা করছে।
ঢাকায় পরপর দুদিনের কাঁপুনি, যা নতুন করে ভাবাচ্ছে সবাইকে
সামান্য ব্যবধানে পরপর দুদিন ঢাকায় মৃদু ও কাঁপুনি দিয়ে ভূমিকম্প জানান দিয়ে গেছে- সামনে এর চেয়েও খারাপ কিছু হয়তো অপেক্ষা করছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় মৃদু থেকে মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই হচ্ছে, যা মানুষের মনে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক মাত্রা ও তীব্র ভূমিকম্প হওয়া অমূলক নয়। ৬-৭ মাত্রার একটি তীব্র ভূমিকম্প হলে রাজধানীর অসংখ্য ভবন ধসে পড়তে পারে, প্রাণহানি ঘটতে পারে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের, এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার।
এই ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল ভবন তৈরি এবং সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অব্যবস্থাপনাকে। প্রকৌশল বিদ্যায় একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।’
প্রতিদিন বিশ্বে ৫৫টি, বাংলাদেশেও থামছে না কাঁপুনি
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প ঘটে। কম্প্রিহেনসিভ আর্থকোয়াক ক্যাটালগের (কমক্যাট) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ৭ বা তার অধিক মাত্রার ১৫-১৬টি বড় ভূমিকম্প ঘটে বিশ্বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের মাত্রা (ম্যাগনিটিউড) এবং তীব্রতা (ইনটেনসিটি) দুটো ভিন্ন বিষয় হলেও একে অপরের সহযোগী। দুটোই বেশি হলে তৈরি হয় বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, যেমনটি হয়েছে ভেনিজুয়েলায়।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি চক্র বা ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর আসে। ইতিহাসে দেখা যায়, ১৭৬২ সালে আরাকানে ৮ বা তার কাছাকাছি মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.১ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হয়েছিল। সে হিসাবে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প এখনই আঘাত হানবে এমনটি নয়, আবার কখন সেটি ঘটবে তা বলাও মুশকিল।
বুয়েট বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা: ৭ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময়
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, দেশে ৭ বা ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময় আঘাত হানতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৬৯ সালে আসামের কাছাড়ে ৭.৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল আর্থকোয়েক ৭.১ (যে ফল্টের ওপর ভিত্তি করে যমুনা সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে), ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০-২০০ বছরের চক্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প এখন যে কোনো সময় ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আশপাশে বেশ কয়েকটি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্ট লাইন রয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ইন্ডিয়া বর্ডার পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার লম্বা ডাউকি ফল্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্লেট বাউন্ডারি-১ (আরাকান ফল্ট—যা সরাসরি চট্টগ্রামের কাছ দিয়ে গেছে), প্লেট বাউন্ডারি-২ (নোয়াখালী থেকে সিলেট) এবং প্লেট বাউন্ডারি-৩ (সিলেট থেকে কাছাড়) একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে।
ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসের আশঙ্কা—কিন্তু কোনগুলো, তা অজানা
মেহেদী আহমেদ আনসারী আরও বলেন, এরকম একটি বিপর্যয় হলে তার জন্য প্রস্তুতি আসলে কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। জাইকা ও সিডিএমপির একটি জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। কিন্তু এই ৭২ হাজার ভবন কোনগুলো, তা নির্দিষ্ট করা নেই।
তিনি জানান, ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১৫ লাখই ছোট বিল্ডিং, টিনশেড বা বস্তি, যা ভেঙে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা কম। কিন্তু মূল বিপদের কারণ অবশিষ্ট ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবন, যেগুলো চার তলার ওপরে। তাঁর প্রাথমিক ধারণায়, এর মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রাক্কলন অনুযায়ী অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। এর সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা, পরিবারগুলোর পথে বসা এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির নেই। তাই সরকারকে এ বিষয়ে এখন থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
এক বছরে ৫২টি ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর
গত বছরের ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়—যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প। তারপর থেকে প্রায়শই কেঁপে উঠছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত দেশে ৫২টি ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫.৭ এবং সর্বনিম্ন ২.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড আছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেন, ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস নেই—কোন এলাকায় কখন কোন মাত্রায় ভূমিকম্প হবে, তা বলার সুযোগ নেই। তবে ১০০-২০০ বছর আগের ভূমিকম্পের ডাটা দেখে ধারণা দেওয়া হয় এবং দেখা হয় সে অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে কিনা।
তিনি বলেন, গত ৩০০-৪০০ বছরে রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে এমন রেকর্ড নেই। বড় বড় যত ভূমিকম্প হয়েছে, তার সবই ঘটেছে ফল্টগুলোতে—যার মধ্যে চট্টগ্রামের কাছের আরাকান ফল্টও আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মিয়ানমারে বা অন্য ফল্টগুলোতেও বড় ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব ঢাকায়ও পড়বে, কারণ ঢাকার অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বড় ভূমিকম্প দূরে হলেও বিশাল ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়।
প্রস্তুতি কোথায়, প্রশ্ন থেকেই যায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি বলতে সরকার মূলত ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি কেনাকেই প্রাধান্য দেয়। কিন্তু মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ভবন নির্মাণে। একটি বহুতল আবাসিক ভবনকে (৫ কাঠা) রেট্রোফিটিং বা মজবুত করতে খরচ হয় আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। একটি ভবনে যদি ১০টি ফ্ল্যাট থাকে এবং মালিকরা প্রত্যেকে ৫-৬ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন, তবে ওই ভবনের ৫০ জন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সদ্য স্নাতক পাশ করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’র ওপর ৩ মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং পেশাজীবী ইঞ্জিনিয়ারদের ১-২ সপ্তাহের রিফ্রেশার কোর্স করাতে হবে, কারণ প্রকৌশলীদের মধ্যেও ভূমিকম্প সহনশীল নকশা সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে।
এ ছাড়া রাজউকের আওতাধীন ১৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ৮টি জোনে ভাগ করে জোনভিত্তিক ভবনের অবস্থা যাচাইয়ের কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যমান ভবনের মূল্যায়নের জন্য ‘থার্ড পার্টি ভেরিফিকেশন’ বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে—এই নিরপেক্ষ পরামর্শক সংস্থা ছাড়পত্র দিলেই কেবল রাজউক বা সিটি করপোরেশনগুলো ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ প্রদান করবে। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য, ভবন সঠিকভাবে তৈরি করা গেলে অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
চট্টগ্রামের জন্য এই বার্তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকার ভবনগুলো নিয়ে যত আলোচনা হোক, এই প্রতিবেদনের শুরুতেই যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—ভূতাত্ত্বিক বিচারে চট্টগ্রাম কোনোভাবেই নিরাপদ দূরত্বে নেই। আরাকান ফল্ট, ভারতীয় প্লেট ও বার্মিজ মাইক্রোপ্লেটের সংঘর্ষস্থল—এসবই চট্টগ্রামের খুব কাছেই অবস্থিত। তাই যখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময় আঘাত হানতে পারে, তখন চট্টগ্রামের জন্য এই কথাটার ওজন আলাদা।
বন্দরনগরীর ক্রমবর্ধমান বহুতল ভবন, ঘনবসতি আর দ্রুত নগরায়ণের মধ্যে রেট্রোফিটিং, বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ এবং তৃতীয় পক্ষের যাচাই ব্যবস্থা- এই সুপারিশগুলো তাই কোনো বিমূর্ত আলোচনা নয়, বরং চট্টগ্রামের নিজের জন্যও একটা জরুরি প্রস্তুতির তালিকা। মাটির নিচে যে শক্তি জমে থাকে, তা কখন বের হয়ে আসবে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু সেই দিনের জন্য আজ থেকে প্রস্তুত থাকাটাই একমাত্র উপায়, যা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।