সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

একটি রায়ের কপির অপেক্ষা

চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের ওপর
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১ জুলাই ২০২৬ | ১২:১১ অপরাহ্ন


গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে যখন ভোটের ফলাফল আসতে শুরু করে, চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর জয়ের খবর পেয়ে তাঁর সমর্থকেরা আনন্দে মেতে ওঠেন। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আদালতের আদেশে তাঁর ফলাফল তখনই স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। চার মাস আইনি লড়াইয়ের পর মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ চূড়ান্ত রায়ে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতাই বাতিল করে দিল। কারণ একটাই, ঋণখেলাপি হিসেবে তাঁর প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ছিল না।

যেভাবে আইনি জটে আটকে গেলেন আসলাম

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনে আসলাম চৌধুরী তাঁর কাগজপত্র দাখিল করেন। এরপরই শুরু হয় আইনি লড়াই। ৩ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর পক্ষে রিটার্নিং অফিসারের কাছে আপত্তি জানানো হয়। অভিযোগ ছিল ঋণখেলাপির। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার তখন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন।

এরপর নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হলে সেখানেও একই সিদ্ধান্ত আসে। কমিশনের যুক্তি ছিল, আসলাম চৌধুরী মূল ঋণগ্রহীতা নন, তিনি শুধু ঋণের জামিনদার। ১৮ জানুয়ারির শুনানিতে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলেও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সেদিন সরাসরি আসলাম চৌধুরীকে বলেছিলেন, ব্যাংকের ঋণটা দিয়ে দিন, না দিলে জনরোষ তৈরি হবে।

ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করা হলে হাইকোর্টও তা খারিজ করে দেন। ফলে আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান। তবে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ সেই আবেদন মঞ্জুর করে শর্ত দেয়, আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, কিন্তু সফল হলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ফলাফল স্থগিত থাকবে। ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংকও পৃথকভাবে আবেদন জানায় আদালতে।

নির্বাচনে ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়ী হলেন আসলাম চৌধুরী, কিন্তু ফলাফল আটকে থাকল আদালতের আদেশে। দেশের ২৯৮ জন সংসদ সদস্য শপথ নিলেন, চট্টগ্রাম-৪ আর চট্টগ্রাম-২ আসনের দুজন রয়ে গেলেন বাইরে।

শেষ পর্যন্ত ১০ জুন শুনানিতে দুই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়ে আপিল বিভাগ শুনানি চালায়। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ চূড়ান্ত রায়ে জানায়, ঋণখেলাপি হিসেবে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল।

এরপর কী হবে সেই আসনে

রায়ের পর প্রশ্ন উঠেছে, এখন চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভবিষ্যৎ কী? দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াতের আনোয়ার সিদ্দিকীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি নতুন নির্বাচন? আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে এ বিষয়টি স্পষ্ট নয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপির অপেক্ষায় আছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, পুনর্ভোটের নির্দেশনা এলে এ আসনে উপনির্বাচন হবে না, বরং নতুন তপশিল দিয়ে নতুন করে ভোটের আয়োজন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে যোগ্য যেকেউ অংশ নিতে পারবেন। আসলাম চৌধুরীও ঋণের অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠতে পারলে আবারও প্রার্থী হতে পারবেন।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে এর পরিণতি কী হবে বলা ঠিক হবে না। তবে উপনির্বাচন হতে পারে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, হতে পারে।

জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল মঞ্জুর মানেই আসলাম চৌধুরী অযোগ্য হয়ে গেছেন। প্রচলিত নিয়মে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে পরের জন নির্বাচিত ঘোষিত হন। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলেই সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, ঋণের জামিনদারেরও ঋণগ্রহীতার মতো একই দায়দায়িত্ব থাকে, এই বিষয়টি আপিল বিভাগের রায়ে স্পষ্ট হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

এদিকে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় বসে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে বলে জানিয়েছে ইসি সূত্র।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম-৪ আসনে নয়জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়েছিলেন। বিএনপির আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে শীর্ষে থাকলেও তাঁর ফলাফল স্থগিত ছিল। জামায়াতের আনোয়ার সিদ্দিকী পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। একই ধরনের আইনি জটিলতায় চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির সরোয়ার আলমগীরও এখনও শপথ নিতে পারেননি। বৃহস্পতিবার ওই আসনের বিষয়ে হাইকোর্টে শুনানির কথা রয়েছে।