সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

শুকিয়ে যাচ্ছে আনোয়ারা-কর্ণফুলীর নলকূপ, সংকটে লাখো মানুষ

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ৩ জুলাই ২০২৬ | ১১:২২ পূর্বাহ্ন


রহিমা বেগমের সংসার চলে স্বামীর সামান্য মজুরিতে। ভোরবেলা উঠেই তাঁকে ছুটতে হয় পানির খোঁজে। উঠানের নলকূপটা আজ তিন মাস ধরে শুকনো। পাড়ার মসজিদের কাছে যে পাম্পটা ছিল, সেটাও এখন নিস্তব্ধ। এক কলসি পানির জন্য এখন তাঁকে হাঁটতে হয় প্রায় আধা কিলোমিটার।

আনোয়ারার চাতরী ইউনিয়নের এই গৃহিণী বলেন, “আষাঢ় মাসে মাথার ওপর বৃষ্টি পড়ছে, আর আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি- এটা কি কেউ বিশ্বাস করবে?” বিশ্বাস না হলেও এটাই এখন আনোয়ারা-কর্ণফুলীর বাস্তবতা।

ভরা বর্ষায়ও শুকনো নলকূপ, গ্রামে গ্রামে হাহাকার

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী- দুটি উপজেলাজুড়েই এখন একই চিত্র। যে নলকূপে একসময় একশো থেকে দেড়শো ফুট গভীরেই পানি মিলত, সেখানে এখন সাতশো থেকে আটশো ফুট নামলেও পানির দেখা নেই। শুষ্ক মৌসুমে সংকট ছিল আগেও, কিন্তু এখন ভরা বর্ষাতেও নলকূপ শুকিয়ে থাকছে। আনোয়ারার বারখাইন, বৈরাগ, চাতরী আর কর্ণফুলীর চর পাথরঘাটা, ডায়মন্ড পার্ক ও শিকলবাহায় সংকট সবচেয়ে তীব্র।

চাতরীর বাসিন্দা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, আষাঢ়-শ্রাবণেও দিনভর পাম্প চালিয়ে এক ফোঁটা পানি তোলা যাচ্ছে না। দূর থেকে কিনে বা সংগ্রহ করে পানি আনতে হচ্ছে। বর্ষার মাঝেও পানি কেনার এই দৃশ্য এলাকার মানুষের কাছে নতুন এক দুঃস্বপ্ন।

কারখানার বিশাল মোটরে উধাও হচ্ছে ভূগর্ভের পানি

এই সংকটের মূলে রয়েছে শিল্পায়নের লাগামহীন বিস্তার। টানেল চালুর পর আনোয়ারা-কর্ণফুলী অঞ্চলে কারখানার সংখ্যা ও আকার দুটোই বেড়েছে বহু গুণ। কাফকো, কোরিয়ান ইপিজেড, ডাইং ও ওয়াশিং কারখানা, ডায়মন্ড সিমেন্ট, জুট মিল, পেপার মিল এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন মাটির গভীর থেকে কোটি কোটি গ্যালন পানি তুলে নিচ্ছে।

কাফকোর বিশাল উৎপাদন প্রক্রিয়া, কুলিং সিস্টেম ও আবাসিক এলাকার জন্য দৈনিক কয়েক লাখ গ্যালন পানি উত্তোলন হচ্ছে গভীর নলকূপের মাধ্যমে। কোরিয়ান ইপিজেডে টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানার উৎপাদনেও যাচ্ছে বিপুল পানি। ডাইং ও ওয়াশিং কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি পানি অপচয় করছে। একদিকে চলছে এই যথেচ্ছ উত্তোলন, অন্যদিকে অপরিকল্পিত আবাসন ও কারখানার অবকাঠামো নির্মাণে ভরাট হয়ে গেছে শত শত পুকুর, ডোবা ও বিল। ফলে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে রিচার্জ হওয়ার পথও বন্ধ। দুই দিক থেকে একসঙ্গে চাপ পড়ায় পানির স্তর নামছে দ্রুতগতিতে।

ধান মাঠে শুকিয়ে গেছে, চাষাবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন কৃষকেরা

পানির এই সংকটে সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে কৃষিতে। বৈরাগের কৃষক আবদুস সবুর বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে এই মাটিতে চাষ করেছেন, কিন্তু এমন দুর্দিন কখনো দেখেননি। এবার বোরো মৌসুমে সেচের পানি না পেয়ে খেতের ধান মাঠেই শুকিয়ে গেছে। কারখানার বড় মোটর দিনরাত পানি টানছে, আর ছোট কৃষকেরা পানির অভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছেন।

কর্ণফুলীর শিকলবাহার কৃষক মো. ইউনুসের কথা আরও করুণ। চারপাশের ডোবা-নালা ভরাট হয়ে কারখানা হয়ে গেছে। সাতশো ফুট বোরিং করেও নলকূপে সুতা ছিটানো পানি উঠছে না। এই অবস্থায় চাষাবাদ ছেড়ে অন্য কাজ খোঁজা ছাড়া উপায় নেই বলে জানান তিনি।

পানির স্তর শূন্য হতে থাকায় আরেকটি বিপদও ঘনাচ্ছে। মিঠা পানির জায়গায় মাটির নিচে প্রবেশ করছে সমুদ্রের লোনা পানি। মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে চাষাবাদ পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

আনোয়ারার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রিয়াংকা চাকমা স্বীকার করেন, শিল্পায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পানির চাহিদা বেড়েছে, আর অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনে স্তর নামছে। সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, কারখানাগুলোকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নদীর পানি শোধন করে ব্যবহার করতে হবে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

পরিবেশবিদরা সতর্ক করছেন, মাটির নিচের পানির এই শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হতে পারে। আনোয়ারার ইউএনও মো. মহিন উদ্দীন অবৈধ পানি উত্তোলনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

কিন্তু হুঁশিয়ারিতে তো আর রহিমা বেগমের নলকূপে পানি আসে না। ভরা বর্ষায় খালি কলসি নিয়ে পথে নামা সেই মানুষগুলোর জন্য এখন দরকার কথা নয়, কাজ।