সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সরকারি আবেদনের তথ্য ফাঁস, ফাঁদে পড়লেন আবেদনকারীরা

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ৩ জুলাই ২০২৬ | ৬:৪৫ অপরাহ্ন


বাবলু হোসেনের পরিবারে পানির সংকট দীর্ঘদিনের। চট্টগ্রামের আনোয়ারার বন্দর এলাকায় তাঁর বাড়ির নলকূপ শুকিয়ে গেছে বহু আগেই। সরকারি সাবমার্সিবল পাম্পের কথা শুনে আশার আলো দেখেছিলেন তিনি। পাঁচ মাস আগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ে গিয়ে বিধিমতো আবেদন জমা দিয়েছিলেন। এরপর অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন।

মাসখানেক আগে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো। ওপাশ থেকে মসৃণ কণ্ঠে বলা হলো, বরাদ্দ হয়ে গেছে, শুধু সরকারি ফি বাবদ আঠারো হাজার টাকা বিকাশ করতে হবে। সরকারি কাজ, সরকারি ভাষা- বাবলু সন্দেহ করেননি। টাকা পাঠালেন। আর তারপরই ফোন বন্ধ। স্বপ্নও বন্ধ।

বাবলু একা নন। আনোয়ারা উপজেলায় সরকারি সাবমার্সিবল পাম্পের জন্য আবেদন করা অন্তত ছয়জন একই ফাঁদে পা দিয়েছেন। গুয়াপঞ্চক মোহাম্মদ উল্লাহ পাড়া জামে মসজিদের পাম্পের আবেদনকারীসহ মোট ছয়জন একইভাবে আঠারো হাজার টাকা করে খুইয়েছেন। প্রতিটি ঘটনার ধরন এক- ফোন, পরিচয়, বিকাশ, তারপর নীরবতা।

ভুক্তভোগীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন তীরের মতো বিঁধছে। তারা যে আবেদন করেছিলেন, সেই তথ্য- নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা প্রতারকেরা পেল কোথা থেকে? এই তালিকা তো শুধু জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের কাছেই থাকার কথা। তাহলে কি অফিসের ভেতর থেকেই বেরিয়েছে এই তথ্য?

স্থানীয়দের সন্দেহ স্পষ্ট- কার্যালয়ের কোনো অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এই তথ্য বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়।

প্রতিকার চাইতে গিয়ে পেলেন উপেক্ষা

প্রতারণার শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা ছুটলেন আনোয়ারা উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রিয়াঙ্কা চাকমার কাছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা পেলেন, তাতে ক্ষোভ আরও বাড়ল। প্রকৌশলী তাঁদের বললেন, “প্রতারকেরা আপনাদের খুঁজে পেয়েছে, এখানে আমাদের কী করার আছে?”

টাকা গেছে, পাম্প মেলেনি, আর এখন সরকারি কার্যালয় থেকেও মিলল না কোনো সহানুভূতি বা সহযোগিতা। এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে প্রিয়াঙ্কা চাকমার হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য ফাঁস ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

তবে ঘটনাটি জানতে পেরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন আনোয়ারার ইউএনও মো. মহিন উদ্দীন। তিনি বলেন, সরকারি সেবার আবেদনকারীদের তথ্য বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি গুরুতর অপরাধ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের কেউ এই তথ্য ফাঁসে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অবিলম্বে থানায় লিখিত অভিযোগ বা জিডি করার পরামর্শ দেন তিনি। সতর্ক করে বলেন, সরকারি কোনো সেবার জন্য বিকাশে টাকা লেনদেনের কোনো বিধান নেই।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল এখন তথ্য ফাঁসের ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।

পানির জন্য আবেদন করেছিলেন বাবলু। পেলেন প্রতারণা। আর যে অফিসে বিচার চাইতে গেলেন, সেখান থেকে পেলেন উপেক্ষা। প্রশ্ন হলো- সাধারণ মানুষ তাহলে যাবেন কোথায়?