সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

অর্থ পাচার: ৬ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, সাইপ্রাস-যুক্তরাজ্যে সম্পদ জব্দ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন


বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকারের বিশেষ টাস্কফোর্স। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে সাইপ্রাসে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল বাড়ি জব্দের আদেশ দিয়েছে দেশটির আদালত।

যাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তারা হলেন—সাইফুল আলম চৌধুরীর এস আলম গ্রুপ, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা এবং ওরিয়ন গ্রুপ।

সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখা (বিএফআইইউ) দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত করে অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সাইপ্রাসসহ দেড় ডজনের মতো দেশ ও এলাকার নাম পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, সাইপ্রাস এবং আইল অব ম্যানে এস আলম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান পরিবারের কিছু সম্পদ জব্দ করেছে সেদেশের সরকার।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, অন্য দেশের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। প্রচলিত আইনের বিচ্যুতি যাচাই করেই তারা সম্পদ জব্দ করে।

তিনি আরও জানান, পাচারের অর্থ পুনরুদ্ধারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে নয়টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে পারলেই কেবল তারা ফি পাবে।

তবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অর্থ দেশে ফেরানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক শতাংশ ফেরত আসে এবং এর জন্য ৭ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর জানান, তৃতীয় দেশ হয়ে এই অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে প্রবেশ করায় সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জোগাড় করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে।

সরকার পাচারের অর্থ যাওয়া শীর্ষ ১০টি দেশের কাছে আইনগত সহায়তা চুক্তির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং হংকং ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি সংসদে জানান, এটি জনগণের অর্থ এবং তা ফিরিয়ে এনে দেশের কল্যাণে ব্যয় করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও জানান, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে অভিযোগ অস্বীকার করে আইনি লড়াই চালানোর কথা জানিয়েছেন। বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির পাশাপাশি সাইফুল আলম ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে একটি মামলাও দায়ের করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তত একটি মামলাতেও জয়লাভ করে পাচারের অর্থ দেশে ফেরানো সম্ভব হলে তা অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।