সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

লোকসানি টানেলে সাত তারকা অতিথিশালা বিলাস

খালি ভবন পাহারায় লাখ টাকার অপচয়
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ৫ জুলাই ২০২৬ | ১:৪৩ অপরাহ্ন


নুরুল আবছারের পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আনোয়ারায় ফসল ফলিয়েছে। সেই উর্বর জমি, সেই লবণের মাঠ- একদিন সরকারি কর্মকর্তারা এসে বললেন, জমি লাগবে, দেশের বড় কাজে। নুরুল আবছার আপত্তি করেননি। জমি গেল। কিছুদিন পরে সেই জমিতে উঠল চকচকে বিলাসবহুল ভবন, সুইমিংপুল, সাজানো বাগান।

নুরুল আবছার ভাবলেন, অন্তত দেশের কাজে তো লাগল। কিন্তু আজ দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ভবনে কোনো অতিথি নেই। দরজায় শুধু পাহারাদার। আর রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে সেই শূন্য ভবন আলোকিত রাখতে। নুরুল আবছার বলেন, “জমিও গেল, টাকাও গেল। এটা আমাদের ক্ষতে নুনের ছিটা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।”

সাড়ে চারশো কোটির বিলাস, অতিথি শূন্য

কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত নগরী। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের কথা মাথায় রেখে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে সাত তারকা মানের অতিথিশালা ও ৩০টি রেস্টহাউস। পাঁচ হাজার বর্গফুটের আধুনিক বাংলো, ছয়টি বিলাসবহুল কক্ষ, সামনে ঝকঝকে সুইমিংপুল- সবই আছে। শুধু নেই অতিথি।

উদ্বোধনের পর থেকে এই জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনাটি পড়ে আছে অলস। চালু করার মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই, ব্যবস্থাপনার কাঠামো নেই। বিলাসিতার এই স্মারকটি এখন আসলে একটি দামি ভুতুড়ে বাড়ি।

আয় ১১ লাখ, ব্যয় সাড়ে ৩৭ লাখ- প্রতিদিন

টানেলের আর্থিক চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম যানবাহন চলায় টোল থেকে প্রতিদিন গড় আয় মাত্র ১১ লাখ টাকা। অথচ বিদ্যুৎ, লাইটিং, এসি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। চীনা ঠিকাদারকে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা।

প্রতিদিনের এই বিশাল ঘাটতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে চাপছে অব্যবহৃত অতিথিশালার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। সহজ হিসাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র প্রতিদিন একটি খালি বিলাসবহুল হোটেল পাহারা দেওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা গুনছে।

অর্থনীতিবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এটিকে বলছেন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার করুণ পরিণতি। দ্রুত বাণিজ্যিক বিকল্প না খুঁজলে এটি চিরতরে একটি সাত তারকা সাদা হাতি হয়েই থাকবে বলে তাঁরা সতর্ক করছেন।

লিজ দেওয়ার চেষ্টা, কিন্তু শর্তের জাঁতাকলে আটকা

লোকসান কমাতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ অতিথিশালা ও রিসোর্ট এলাকাটি ২৯ বছরের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু প্রথম দরপত্রে শর্ত ছিল এতটাই কঠিন- পাঁচ বছরের হোটেল ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা এবং কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার তরল সম্পদ- যে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। দরপত্র ভেস্তে গেছে।

বিবিএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে জানান, এরপর দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগের সুযোগ দিয়ে এবং তরল সম্পদের শর্ত শিথিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

কর্ণফুলী টানেল সাইট অফিসের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী জানান, নিজস্ব জনবলে এত বড় স্থাপনা চালানো সম্ভব নয়। তাই সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ২৯ বছরের জন্য বুঝিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

এদিকে এই অতিথিশালা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে পারকি সৈকত এলাকায় পর্যটন করপোরেশন আরেকটি আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে। একই এলাকায় দুটি পর্যটন স্থাপনা- একটি অর্ধেক তৈরি, অন্যটি তৈরি হয়েও অব্যবহৃত। পরিকল্পনার এই অসংগতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও গভীর।

নুরুল আবছারের জমি ফেরত আসবে না। রাষ্ট্রের খরচ হওয়া কোটি টাকাও ফেরত আসবে না। প্রশ্ন শুধু একটাই- এই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে কি?