
১০ জুলাই, দুপুর। আনোয়ারার বরুমচড়া ইউনিয়নের সর্দার পাড়া তখন হাঁটুসমান কাদাপানির নিচে। রাস্তা বলতে যা ছিল, তা মিশে গেছে ভাঙা খালের সঙ্গে। এই পাড়ারই এক ঘরে বসে আছেন মো. ইদ্রিস—নির্বাক, শূন্য দৃষ্টি। আগের দিন সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানের পানিতে ডুবে মারা গেছে তাঁর শিশুসন্তান ইশতিয়াক। শোকের সেই ঘরে বাইরের জগৎ তখন যেন থমকে আছে।
ঠিক তখনই কাদা মাড়িয়ে, ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে সেই উঠানে এসে দাঁড়ান একজন মানুষ—আনোয়ারা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দীন। প্রশাসনিক প্রটোকল বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের নিরাপত্তা ছেড়ে তিনি এসেছেন সরাসরি এক সন্তানহারা বাবার পাশে দাঁড়াতে। ইদ্রিসের হাত ধরে সান্ত্বনা দেন, তুলে দেন তাৎক্ষণিক ২৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা, আশ্বাস দেন পাশে থাকার।
ইদ্রিসের প্রতিবেশী ইউনুচ চৌধুরীর কণ্ঠে তখন বিস্ময় মেশানো স্বস্তি: “প্রশাসনের কোনো বড় কর্মকর্তাকে এভাবে বিপদের দিনে আমাদের ঘরের উঠোনে এসে দাঁড়াতে আগে কখনো দেখিনি।”
এই একটি দৃশ্যই বলে দেয়, আনোয়ারার সাম্প্রতিক দুর্যোগে প্রশাসন ঠিক কোন ভূমিকায় নেমেছে।
পানির নিচে উপজেলা, মাঠে ইউএনও
৯ জুলাই থেকে টানা মুষলধারে বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে আনোয়ারার বিস্তীর্ণ জনপদ তলিয়ে গেছে পানিতে। সড়ক ভেঙেছে, বিদ্যুৎ নেই, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। রায়পুর, জুঁইদণ্ডী, বারখাইন, বৈরাগ ও বারশত—উপকূলীয় এই পাঁচ ইউনিয়নের একেকটি গ্রাম যেন এক-একটি দ্বীপ হয়ে পড়েছে জলের মধ্যে।
দুর্যোগ যখন এমন জটিল রূপ নিচ্ছে, তখন কার্যালয়ে বসে নির্দেশনা দেওয়ার বদলে ইউএনও মহিন উদ্দীন নিজে নেমে পড়েছেন মাঠে। হাঁটু পানি বা কাদা কোনোটিই তাঁর পথ আটকাতে পারেনি। শুকনো খাবার আর ত্রাণসামগ্রী নিয়ে তিনি সরাসরি হাজির হয়েছেন দুর্গত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। সম্ভাব্য আরও বড় দুর্যোগ মাথায় রেখে উপজেলার ৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্রও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে উপজেলা প্রশাসনের সূত্রে।
নদী রক্ষায় আপসহীন অবস্থান
তবে মহিন উদ্দীনের কর্মতৎপরতা কেবল দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আনোয়ারার সাঙ্গু নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের অন্ধকারে অবৈধভাবে বালু তুলছিল—যার মাশুল গুনতে হচ্ছিল গ্রামীণ সড়ক আর ফসলি জমিকে। দিনে অভিযান চললেও রাত নামলেই ড্রেজারের শব্দে ফিরে আসত সেই পুরোনো চিত্র, যা নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ জমছিল বহুদিন ধরে।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে স্পষ্ট ভাষায় ইউএনও জানিয়ে দেন, সাঙ্গু নদীতে কোনো বৈধ “বালু মহাল” নেই, এবং যারা অবৈধভাবে বালু তুলে গ্রামীণ জনপদকে ঝুঁকিতে ফেলছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এই দৃঢ় অবস্থানের পর স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি নতুন করে জোরদার হয়েছে।
যেভাবে গড়ে উঠেছেন এই কর্মকর্তা
৩৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া মহিন উদ্দীনের কর্মজীবনের সূচনাটাও ছিল চ্যালেঞ্জিং। আনোয়ারায় আসার আগে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায়। সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন, নতুন পর্যটন স্পটের বিকাশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বাজার মনিটরিংয়ে তাঁর ভূমিকা তাঁকে এনে দেয় জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বীকৃতি এবং ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার’। সেই ধারাবাহিকতাই যেন তিনি বহন করে এনেছেন আনোয়ারায়।
দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ইউএনও মহিন উদ্দীন বলেন, “বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবার যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়, আমরা সেই চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জনগণের সেবক হিসেবে সংকটের সময়ে তাদের পাশে থাকাটাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি সাঙ্গু নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই—প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা ও নিরাপত্তা পৌঁছে দেওয়া।”
দুর্যোগ কাটবে, ছাপ থেকে যাবে
পানি একদিন নেমে যাবে, ভাঙা সড়ক মেরামত হবে, বিদ্যুৎ ফিরবে ঘরে ঘরে। কিন্তু সর্দার পাড়ার সেই উঠানে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল—একজন সরকারি কর্মকর্তা কাদা মাড়িয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক শোকার্ত বাবার পাশে—তা এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। প্রশাসনিক কঠোরতা আর মানবিক দায়বদ্ধতার এই সমন্বয়েই আনোয়ারার মানুষের কাছে ক্রমশ আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছেন মো. মহিন উদ্দীন।